পশ্চিম এশিয়ায় চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া চরম সংকটের মধ্যেও দেশে জ্বালানি তেলের আমদানি অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। তবে এই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে গিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) সহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে সংস্থাটি। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির প্রথম বৈঠকে উপস্থাপিত বিপিসির এক কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
বিপিসির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে সংস্থাটির প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া দাম এবং দেশে ভর্তুকি মূল্যে তেল বিক্রির কারণে এই মূলধনে টান পড়ে। বাধ্য হয়ে গত সাত মাস ধরে বিভিন্ন প্রকল্প খাত থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তুলে জ্বালানি তেল আমদানি সচল রাখা হয়েছে।
প্রকল্পের অর্থে টান পড়ার বিষয়ে বিপিসি চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম জানান, এই অর্থ বিপিসির নিজস্ব। প্রকল্পগুলোর কাজের অগ্রাধিকার ও অর্থের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে এই তহবিল পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। ফলে ইআরএল-২ সহ অন্য কোনো প্রকল্পের কাজে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে তিনি দাবি করেন।
বিপিসির বিপুল এই লোকসানের সবচেয়ে বড় অংশটি এসেছে ডিজেল থেকে। দেশে ব্যবহৃত পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় ৬৫ শতাংশই ডিজেল। কার্যপত্রে বলা হয়, মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। ফেব্রুয়ারিতে ব্যারেলপ্রতি ডিজেলের দাম ৮৬ ডলার থাকলেও এপ্রিলে তা ২৮৪ দশমিক ৯৫ ডলারে গিয়ে ঠেকে। সে সময় প্রতি লিটার ডিজেলের আমদানি ব্যয় পড়ছিল প্রায় ২০৫ টাকা, অথচ দেশে তা বিক্রি হচ্ছিল মাত্র ১১৫ টাকায়। বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি দাম ১৬৫ ডলারে নেমে এলেও বিপিসির লোকসান অব্যাহত রয়েছে।
চলতি বছরের মার্চে দেশে জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু হলেও জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে প্রায় পাঁচ মাস দাম বাড়ানো হয়নি। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে ধাপে ধাপে দাম সমন্বয় করা হয়। সর্বশেষ গত ২১ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে ডিজেল ১৩৫, কেরোসিন ১৫৫, অকটেন ১৬৫ এবং পেট্রোল ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বিপিসি জানিয়েছে, লোকসান কমানোর পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশে জ্বালানি তেল পাচারের ঝুঁকি কমাতেই এই দাম সমন্বয় করা হয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান কমিটির মঙ্গলবারের বৈঠকে বিপিসির কার্যক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশে জ্বালানি সংকট কেন সৃষ্টি হয়েছিল এবং শুধু তেলের দাম বাড়ানোর ফলেই কীভাবে সেই সংকটের অবসান হলো সে বিষয়ে বিপিসির কাছে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিটি। পাশাপাশি জনগণকে স্বস্তি দিতে জ্বালানির দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার বিষয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে।
ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় বিপিসি তাদের মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। বর্তমানে বিপিসি ও এর আওতাধীন ৬৪টি ডিপোতে ১৬ লাখ ২৭৩ টন জ্বালানি মজুতের সক্ষমতা রয়েছে, যা দিয়ে ৪০ থেকে ৪৫ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। আগামীতে এই মজুত সক্ষমতা বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। এর জন্য কত বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে, তা আওতাধীন কোম্পানিগুলোর নিজস্ব পরিকল্পনা পর্যালোচনার পর নির্ধারণ করা হবে।