https://www.a1news24.com
৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১২:২২

‘শখের’ যুদ্ধই এখন ট্রাম্পের গলার কাঁটা, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে উপায় কি?

ইরানের বিরুদ্ধে সংক্ষিপ্ত ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই যুদ্ধ এখন এক দীর্ঘ ও জটিল মোড় নিয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের অবস্থান ২০২৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ট্রাম্পকে সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সুবিধা ও বিকল্প পথ বাতলে দিতেই নেওয়া হয়েছে এই অনির্দিষ্টকালের সামরিক পরিকল্পনা।

বর্তমানে হোয়াইট হাউসের সামনে তিনটি প্রধান পথ খোলা রয়েছে; ইরানের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ জোরদার করা, একে অপরের ওপর পাল্টাপাল্টি সীমিত হামলা চালানো, অথবা পরিস্থিতিকে বড় আকারের যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া। প্রথমদিকে হেগসেথ এই সামরিক পদক্ষেপকে স্বল্পমেয়াদি বলে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে এটি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়ে এক বিশাল সামরিক উপস্থিতিতে রূপ নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে এখন প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে, যাদের সাথে রয়েছে অন্তত ১৯টি যুদ্ধজাহাজ, একাধিক ফাইটার স্কোয়াড্রন, এয়ার ডিফেন্স ইউনিট এবং প্যারাট্রুপার বাহিনী।

ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ময়দানে দীর্ঘ দিন কাটানোর ফলে সেনাসদস্য ও তাদের পরিবারের ওপর মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে সেনাবাহিনীর এয়ার ডিফেন্স ইউনিটের দায়িত্ব পালনের মেয়াদ ৯ মাস থেকে বাড়িয়ে সরাসরি ১২ মাস করা হয়েছে। এছাড়া ইউরোপ ও প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে যেসব ইউনিটকে মধ্যপ্রাচ্যে স্থানান্তর করা হয়েছিল, সেগুলোকে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে রেখে দেওয়া হয়েছে। সমপরিমাণ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীও। অঞ্চলের ১৯টি যুদ্ধজাহাজের মধ্যে দুটি এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ও ১৩টি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যুদ্ধের শুরু থেকে ব্লকহেড বাস্তবায়নে নিযুক্ত ইউএসএস ডেলবার্ট ডি. ব্ল্যাক এবং ইউএসএস স্প্রুয়েন্স নামক যুদ্ধজাহাজ দুটির প্রায় ৩০০ জন করে কর্মী কোনো বিশ্রাম ছাড়াই টানা কয়েক মাস ধরে সাগরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই দীর্ঘমেয়াদি সামরিক চাপের মাঝেই ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ওপর তীব্র অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির দিকে ঝুঁকছে, যাতে তেহরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা যায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্যেষ্ঠ সহযোগীদের সাথে ট্রাম্প একান্ত আলোচনায় যুদ্ধ সমাপ্তির ঘোষণা দেওয়ার বিষয়ে চিন্তাভাবনা করছেন বলে জানা গেছে। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তীব্র অর্থনৈতিক পতনই হয়তো ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি গুঁটিয়ে নিতে বাধ্য করবে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বার্তা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, মার্কিন বাহিনী বর্তমানে অনেক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালির প্রায় পুরো নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে। ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি ধসে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন, তারা কেবল পতন বিলম্বিত করার চেষ্টা করছে। সেখানে সাধারণ মানুষ কবে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।

অন্যদিকে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক উপদেষ্টারা আশঙ্কা করছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত এবং ক্রমবর্ধমান এই যুদ্ধ আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের ফলাফলে নীতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুদ্ধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি কোনো নির্বাচনী লাভ-ক্ষতির হিসাব করছেন না।

পেন্টাগনের সেনাসদস্যদের ওপর ব্যাপক চাপ থাকা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন সামরিক শক্তি প্রদর্শনে পিছু হটছে না। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাস্ট্র যেকোনো মুহূর্তে ইরানে আরও হামলা চালাতে পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছে। একটি বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, বহু ইরানি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে এবং তাদের রাডার ব্যবস্থা গুঁড়িয়ে দেওয়ায় তারা এখন মার্কিন বাহিনীকে দেখতেও পারছে না। নিজেদের নজরদারি সক্ষমতার প্রশংসা করে তিনি আরও বলেন, তাদের সব কর্মকাণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারিতে রয়েছে এবং সামরিক স্থাপনা ও সরঞ্জাম ইতোমধ্যেই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

সামরিক অভিযানের পাশাপাশি ওয়াশিংটন এখন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ কঠোর করার এবং দেশটির সাথে ব্যবসা করা পরাশক্তি ও বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে, সংক্ষিপ্ত প্রচারণার মাধ্যমে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন একটি জটিল সামরিক ও অর্থনৈতিক দীর্ঘ লড়াইয়ের রূপ নিয়েছে।

সূত্র: এনডিটিভি

আরো..