https://www.a1news24.com
৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১০:৫৪

সুন্দরবনে মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত নিষিদ্ধ মৌসুমেও থামেনি বন লুট এক মাসে ২৬ মামলা

আটক ২৪ নৌকা; বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও হরিণ শিকারের অভিযোগ

 

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, সুন্দরবন থেকে ফিরে:দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্যসুন্দরবনে সরকার ঘোষিত প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা চলাকালেও থেমে নেই বনসম্পদ লুটের অপচেষ্টা। মাছ ও কাঁকড়া আহরণ নিষিদ্ধ থাকলেও রাতের অন্ধকারে সংঘবদ্ধ চক্রের অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার এবং হরিণ শিকারের অভিযোগে গত এক মাসে ২৬টি মামলা করেছে বন বিভাগ। একই সময়ে অভিযান চালিয়ে ২৪টি নৌকা জব্দ, ২৫ বোতল ভারতীয় কীটনাশক উদ্ধার এবং বিপুল পরিমাণ মাছ, কাঁকড়া ও শিকারের বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে।

খুলনা রেঞ্জ বন বিভাগের জুন মাসের অভিযান-সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।বন বিভাগ সূত্র জানায়, প্রতিবছরের মতো চলতি বছরও ১ জুন থেকে সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ এবং পর্যটকদের প্রবেশ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে একাধিক সংঘবদ্ধ চক্র গভীর রাতে বনাঞ্চলে প্রবেশ করে অবৈধভাবে মাছ ও কাঁকড়া আহরণ, বিষ প্রয়োগে মাছ নিধন এবং বন্যপ্রাণী, বিশেষ করে হরিণ শিকারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব অপরাধ দমনে খুলনা রেঞ্জের অধীন বিভিন্ন স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নিয়মিত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। রেঞ্জ কর্মকর্তা ও স্টেশন ইনচার্জদের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে জুন মাসে মোট ২৪টি নৌকা জব্দ করা হয়। একই সময়ে বিভিন্ন অপরাধে দায়ের করা হয়েছে ২৬টি মামলা। এর মধ্যে পাঁচটি পিওআর (POR) এবং ২১টি ইউডিআর (UDR) মামলা।

মামলাগুলোতে মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও তিনজন এখনও পলাতক রয়েছেন।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বিষ প্রয়োগে মাছ শিকারের অভিযোগে ছয়টি মামলা এবং হরিণ শিকার-সংক্রান্ত একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযানের সময় ২৫ বোতল ভারতীয় কীটনাশক ছাড়াও বিপুল পরিমাণ মাছ, কাঁকড়া, জাল, ফাঁদ ও মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগে মাছ আহরণ শুধু মৎস্যসম্পদের জন্য নয়, পুরো বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্যের জন্যও ভয়াবহ হুমকি। এতে মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণী, কাঁকড়া, চিংড়ির পোনা এবং খাদ্যশৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ধ্বংস হয়। একই সঙ্গে হরিণ শিকারের মতো অপরাধ সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ সময়ে বন বিভাগের বিভিন্ন স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। বনসম্পদ ধ্বংসে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় স্থানীয় জনগণসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।”

বন ও পরিবেশসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের মতো সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নিষিদ্ধ সময়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং বন্যপ্রাণী শিকার বন্ধে শুধু টহল জোরদার করলেই হবে না; স্থানীয় জনগণের বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য আরও বড় হুমকির মুখে পড়তে পারে।

আরো..