৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে সাগরে গিয়েই দুর্যোগের কবলে জেলেরা, দাদনের বোঝা নিয়ে বাড়ছে হতাশা
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির,সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, বাগেরহাট: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন উপকূলসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে হঠাৎ সৃষ্টি হওয়া বৈরী আবহাওয়া, প্রবল পূবালী বাতাস ও বিশাল ঢেউয়ের মুখে টিকতে না পেরে শত শত ফিশিং ট্রলার ও মাছ ধরার নৌকা নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খাল এবং উপকূলীয় মৎস্যঘাটে ভিড় করেছে। দীর্ঘ ৫৮ দিনের সরকারি মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ আহরণের আশায় সাগরে যাওয়া জেলেরা যাত্রার শুরুতেই প্রকৃতির নির্মম রূপের মুখোমুখি হয়ে চরম হতাশা নিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সুন্দরবন ও উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত দুই দিন ধরে বঙ্গোপসাগরে তীব্র বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করছে। প্রবল বাতাসে উত্তাল হয়ে উঠেছে সাগর। বিশাল বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে গভীর সাগরে অবস্থান করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শত শত ট্রলার নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য উপকূলের দিকে ছুটে আসে। অনেক ট্রলার সুন্দরবনের দুবলার চরের ভেদাখালী খাল, মেহেরআলী, আলোরকোলসহ বনের বিভিন্ন নিরাপদ খালে নোঙর করেছে।
সুন্দরবনের ভেদাখালী খালে আশ্রয় নেওয়া বাগেরহাটের বগা এলাকার একটি ফিশিং ট্রলারের মাঝি নজরুল ইসলাম শুক্রবার দুপুরে মোবাইল ফোনে জানান, গত দুই দিন ধরে সাগরে প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়া ও ভয়াবহ ঢেউয়ের কারণে ট্রলার নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। জীবন ও সম্পদ রক্ষার স্বার্থে তারা দ্রুত সুন্দরবনের নিরাপদ খালে আশ্রয় নিয়েছেন। আবহাওয়া অনুকূলে না আসা পর্যন্ত সাগরে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
শরণখোলা উপজেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আবুল হোসেন বলেন, বঙ্গোপসাগর এখন অত্যন্ত উত্তাল ও ঝুঁকিপূর্ণ। সাগরের ভয়াবহ পরিস্থিতির কারণে কয়েকশ ফিশিং ট্রলার মোরেলগঞ্জ, শরণখোলার রায়েন্দা, মহিপুর, খেপুপাড়া, নিদ্রাসখিনা, পাথরঘাটা উপকূলসহ সুন্দরবনের বিভিন্ন নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। তিনি বলেন, দীর্ঘ ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে জেলেরা দাদন ও ঋণের টাকায় জ্বালানি, বরফ, খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করে মাছ ধরতে সাগরে গিয়েছিলেন। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই দুর্যোগের কবলে পড়ে তাদের ফিরে আসতে হওয়ায় নতুন করে আর্থিক সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শরণখোলার রায়েন্দা মৎস্যঘাটের আড়তদার কবির হোসেন জানান, বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক ট্রলার সাগরে যেতে পারেনি। গত দুই দিন ধরে তারা রায়েন্দা মৎস্যঘাটেই নিরাপদে নোঙর করে রয়েছে। ফলে পুরো ঘাটজুড়ে ট্রলারের দীর্ঘ সারি ও জটলার সৃষ্টি হয়েছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে বরগুনা উপকূলেও। বরগুনা জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী জানান, সাগরে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে বিপাকে পড়েছেন। উত্তাল সাগরে টিকতে না পেরে অধিকাংশ ট্রলার উপকূলের দিকে ফিরে এসেছে এবং যে যেখানে নিরাপদ স্থান পেয়েছে, সেখানেই অবস্থান নিয়েছে। আবহাওয়া স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কোনো ট্রলারই পুনরায় গভীর সাগরে যেতে পারবে না।
উপকূলীয় মৎস্যসংশ্লিষ্টদের মতে, নিষেধাজ্ঞা শেষে এ সময়টিকে ঘিরেই জেলেদের সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা থাকে। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই বৈরী আবহাওয়া তাদের সেই স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এতে একদিকে যেমন মাছ আহরণ বন্ধ হয়ে গেছে, অন্যদিকে দাদন ও ঋণের চাপ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো জেলে পরিবার। আবহাওয়া দ্রুত স্বাভাবিক না হলে উপকূলের মৎস্য অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।