https://www.a1news24.com
২৭শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১২:৫৮

চুরির মামলায় স্বাক্ষী হওয়ায় ছেলে নিখোঁজ

সাইদুল ফিরে আসার অপেক্ষায় স্ত্রী, শিশু সন্তান ও বাবা-মা

টি আই সানি, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: ফুফাতো ভাইকে চুরির মিথ্যা অপবাদে মারধরের মামলায় স্বাক্ষী হওয়ায় আসামীদের হত্যার হুমকির ভয়ে জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও অপহরণ থেকে রক্ষা পায়নি সিরামিক কারখানার কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম (২৯)। গেল বছরের ২৪ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) দিবাগত মধ্য রাত থেকে সে অপহরণ হয়। ওই সময় থেকে তার তার মুঠোফোন এখনো পর্যন্ত বন্ধ রয়েছে।

এর আগে গেল বছরের ১৭ নভেম্বর (রবিবার) নিজের জীবনের এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার চেয়ে শ্রীপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে সাইদুল। পুলিশ সাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ফাইজুদ্দিনের দায়ের করা মামলার তদন্তের কথা বলে তার বাবার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ করেন তার বাবা।

সাইদুল ইসলাম শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার গ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে। সে বগুড়ায় ডিবিএল সিরামিক কারখানায় ল্যাব সেকশনে কর্মরত ছিল। স্ত্রী, দেড় বছরের শিশু সন্তান এবং বাবা-মা রয়েছে। একমাত্র ছেলের সন্ধান না পেয়ে বাবা ও মা চোখের পানি ফেলছেন।

এদিকে, ছেলে নিখোঁজের পর আতœীয় স্বজনসহ সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুজি করেও না পেয়ে পরদিন ২৬ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) শ্রীপুর থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বাবা মকবুল হোসেন। এক মাস পর রবিবার (২৩ জানুয়ারী) অপহরণ মামলা (নং ৪৮) রুজু করে শ্রীপুর থানা পুলিশ।

সাইদুলের মা বলেন পথের দিকে চেয়ে থাকি আমার ছেলে ফিরে আসবে। কিন্তু এক মাস হয়ে গেলেও ছেলে আর ফিরে আসেনা। নিখোঁজের একদিন পর থানায় সাধারণ ডায়েরি করলেও পুলিশ একমাত্র ছেলেকে উদ্ধারে কোনো সহযোগীতা করছেন না বলে অভিযোগ করেন সাইদুল ইসলামের বাবা। এক মাস পর অজ্ঞাতদেরকে আসামী করে অপহরনের মামলা নেয় পুলিশ।

মকবুল হোসেন জানান, ফুফাতো ভাই আলমগীর হোসেনকে ব্যাটারি চালিত অটো চুরির মিথ্যা অপবাদে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে একই এলাকার ফাইজুদ্দিন ও তার লোকজন। পরে জখমের স্থানে মরিচের গুঁড়া ও লবণ ছিটিয়ে নির্যাতন করে অভিযুক্তরা। নির্যাতনের ২ মিনিট ১৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ওই সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় মামলা রুজু হলে প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় সাইদুল ইসলাম ওই মামলায় স্বাক্ষী হয়। মামলা রুজুর পর আসামীরা এলাকা ছেড়ে আতœগোপনে চলে যায়। পরে তারা আদালতে হাজির হয়ে জামিনে বেরিয়ে এলাকায় এসেই মামলা প্রত্যাহার করতে বলে সাইদুলকে। এক পর্যায়ে আসামীরা (ফাইজুদ্দিন ও তার লোকজন) সাইদুল ও তার বাবা মকবুল হোসেনেকে আসামী করে গাজীপুর আদালতে অটো চুরির মিথ্যা মামলা দায়ের করে। আদালত ওই মামলা গ্রহণ করে গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশকে মামলা তদন্তের নির্দেশ দেয়। মামলা প্রত্যাহার না করলে তাকে অপহরন করে হত্যাসহ পরিবারের লোকদেরকে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি এবং হত্যার হুমকি দেয় আসামীরা। এসব ঘটনায় নিজের জীবনের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার চেয়ে গেল বছরের শ্রীপুর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে সাইদুল। আসামীদের মামলায় শ্রীপুর থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এনামুল হক তদন্তের কথা বলে গেল বছরের ২৪ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় সাইদুল ইসলামকে জৈনাবাজার থেকে আটক করে। পরে সাইদুলের বন্ধু সাকিব হাসান রানার দেখানো মতে স্থানীয় আউয়াল কলেজের পাশে দোতলা ভবনের একটি ঘরে নিয়ে তিন ঘন্টা আটক করে রাখে ওই এএসআই। পরে সাইদুলকে দিয়ে তার বাবার কাছে ফোন দিয়ে জানায় তাকে পুলিশ আটক করেছে। তার বাবা প্রতিবেশী রফিকুল ইসলামকে দোতলা ভবনে পাঠালে ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিলে সাইদুলকে ছেড়ে দেয় এএসআই এনামুল হক। পরে সাইদুল রাত সাড়ে ৮টার দিকে বাসায় চলে আসে। কিছুক্ষন পর একটি ফোন পেয়ে সে (সাইদুল) বাড়ী থেকে বের হয়। রাত সাড়ে ১১ টার দিকে স্ত্রী তার মুঠোফোনে ম্যাসেজ দিয়ে বলে কখন আসবা? উত্তরে সে জানায় তোমাকে বলে আসলাম একটু লেট হবে। তবে ১২টার আগেই চলে আসব, ইনশাল্লাহ। তুমি মা’র কাছ থেকে খাওন (রাতের খাবার) আইনা রাখো। রাত ১টা বেজে গেলেও সাইদুল না আসলে স্ত্রী ১টা ১১ মিনিটে তার মুঠোফোনে কল দিলে বন্ধ পায়। সকাল হলেও সাইদুল বাসায় না আসায় আতœীয় স্বজনসহ সম্ভাব্য সব স্থানে খোঁজাখুজি করে না পেয়ে পরদিন ২৬ ডিসেম্বর শ্রীপুর থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বাবা মকবুল হোসেন। পরে ২৩ জানুয়ারী অপহরণ মামলা (নং ৪৮) রুজু করে শ্রীপুর থানা পুলিশ।

তিনি আরো জানান, এর আগে সাকিব হাসান রানা সাইদুলকে ফিরিয়ে দিতে তার কাছে কখনো এক লাখ, কখনো ৫০ হাজার টাকা দাবী করে এবং বলে সে (সাইদুল) উত্তরা এক জায়গায় আছে। ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে তার বাবাকে উত্তরায় ছেলের কাছে নিয়ে যাওয়ার জন্য দুই দিন তারিখ দিয়েও রানা আর দেখা করেনি। ফোন দিলে বলে সাইদুর সেভ মতোই আছে, সময় হলেই বের হয়ে আসবে। এসব বিষয়গুলো পুলিশকে জানালে পুলিশ তার ছেলেকে উদ্ধারে কোনো উদ্বোগ নেয়নি। উল্টো পুলিশ বলে যদি আপনার ছেলে এসে পড়ে তাহলে আপনাকেও জেল খাটতে হবে। গত দুইদিন যাবত রানা এলাকা ছেড়ে আতœগোপনে রয়েছে এবং তার মুঠোফান বন্ধ পাওয়া যায়।

সাইদুল ইসলামের স্ত্রী মিম আক্তার বলেন, ফাইজুদ্দির বাড়ীর এক নারী ভাড়াটিয়া বলেছে সে আমার স্বামীকে নিখোঁজের রাত আনুমানিক ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে তাদের বাড়ীর গেইটের সামনে দিয়ে যেতে দেখেছে।

অভিযুক্ত সাকিব হাসান রানা ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার রাজৈ ইউনিয়নের উড়াহাটি গ্রামের রমজান আলীর ছেলে। সে জৈনাবাজরে দীর্ঘদিন যাবত রানা কম্পিউটার নামে একটি দোকান পরিচালনা করে আসছে। সাইদুল নিখোঁজের পর থেকে সে এলাকায় অবস্থান করলেও থানায় অপহরণ মামলা রুজুর পর সে (সাকিব হাসান রানা) এলাকা ছেেেড় আতœগোপনে রয়েছে। এরপর থেকে তার মুঠোফোনও বন্ধ রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে রানার মুঠোফোনে একাধিকাবার ফোন দিলেও বন্ধ থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আদালতে দায়ের করা ফাইজুদ্দিনের মামলায় গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ সাইদুল ও তার বাবা মকবুল হোসেনের বিষয়ে তদন্ত চেয়ে প্রতিবেদন দিতে বলে শ্রীপুর থানা পুলিশকে। ওই তদন্তের প্রেক্ষিতে সাইদুলকে জৈনাবাজার থেকে আটক করে এএসআই এনামুল। পরে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে তাকে তিন ঘন্টা দোতলা ভবনের একটি ঘরে আটক করে রাখে এএসআই।

সাইদুল ইসলাম নিখোঁজ সংক্রান্ত সাধারণ ডায়েরির (জিডি) তদন্ত কর্মকর্তা শ্রীপুর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রেজাউল করিম জানান, আমরা সর্বাতœক চেষ্টা করেছি তার সন্ধান পাওয়ার জন্য। সাইদুলের মুঠোফোন বন্ধ থাকার পরও আমরা প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সন্ধান পায়নি। শুনেছি এ ঘটনায় অপহরণ মামলা হয়েছে।

শ্রীপুর থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) এনামুল হক জানান, গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের আবেদনের প্রেক্ষিতে ঘটনা তদন্ত করার জন্য ২৪ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) সন্ধ্যায় জৈনা বাজার গিয়েছিলাম। এসময় বাজারেই সাইদুলের সাথেকথা বলে চলে এসেছি। তাকে তিন ঘন্টা আটক এবং ১০ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তিনি আরো বলেন, শুনেছি ওইদিন রাত থেকে সাইদুলকে পাওয়া যাচ্ছে না এবং এ ঘটনায় শ্রীপুর থানায় একটি অপহরণ মামলা রুজু হয়েছে।

শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জয়নাল আবেদীন মন্ডল জানান, অমরা মামলা নিয়েছি। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধারে চেষ্টা করছি। আশা করছি দ্রæত সময়ের মধ্যেই আমরা একটি ফলাফল জানাতে পারব।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ অক্টোবর (মঙ্গলবার) সকালে উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার গ্রামে ব্যাটারি চালিত অটো চুরির মিথ্যা অপবাদে সাইদুল ইসলামের ফুফাতো ভাই আলমগীর হোসেন এবং মাইনুদ্দিনকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে নির্যাতন চালায় একই এলাকার ফাইজুদ্দিন ও তার লোকজন।

আরো..