গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে অন্যায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে আগ্রাসনবাদী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এরপর এক মাসেরও বেশি সময় গড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে অনেকটাই দিশেহারা হয়ে পড়েছে যুদ্ধবাজ দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, আর কয়েক সপ্তাহ চলবে যুদ্ধ। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সেনা পাঠানো এবং হামলার হুমকিও অব্যাহত রেখেছেন ট্রাম্প। তবে আগ্রাসনকারীদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত লড়াই চলবে বলে জানিয়েছে ইরান।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, ইরানজুড়ে চলমান সামরিক অভিযানের লক্ষ্যমাত্রা কয়েক মাসের মধ্যে নয়, বরং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই অর্জিত হবে।
তবে, যুদ্ধের ময়দানে ধ্বংসযজ্ঞ চললেও পর্দার আড়ালে তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনার পথও খোলা রেখেছে ওয়াশিংটন— এমন দাবিও করেন তিনি।
আল-জাজিরাকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে রুবিও স্পষ্ট করেছেন, ইরানকে তাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ত্যাগ করতে হবে।
রুবিও যুদ্ধের এই সংকটময় মুহূর্তে স্পেনের মতো ন্যাটো মিত্রদের অসহযোগিতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে সামরিক জোটের ভবিষ্যৎ কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
মার্কো রুবিও বলেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ না থাকলেও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা সচল রয়েছে। পর্দার আড়ালে এই প্রক্রিয়া বর্তমানে চালু আছে ইরানের ভেতরকার কিছু পক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান, সরাসরি কিছু কথা হচ্ছে, যা মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমেই ঘটছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সবসময়ই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করাকে অগ্রাধিকার দেন।
তবে, একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, দ্রুত যুদ্ধবিরতি না হলে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ‘নিশ্চিহ্ন’ করে দেয়া হবে। ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি কিম্বার্লি হালকেট জানিয়েছেন, রুবিও এমন এক সময়ে এই মন্তব্য করলেন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
কিম্বার্লি আরও বলেন, “রুবিওর বক্তব্য এবং ট্রাম্পের পোস্টগুলো থেকে বোঝা যায় যে, যুক্তরাষ্ট্র একটি ‘দ্বিমুখী নীতি’ অনুসরণ করছে। তারা একদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখছে, আবার অন্যদিকে ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়ে চলেছে।”
অপরদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, “ইরানে যুদ্ধ চার থেকে ছয় সপ্তাহ চলতে পারে বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।”
সংবাদ সম্মেলনে ক্যারোলিনকে প্রশ্ন করা হয়, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বর্তমান সময়সীমা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী ভাবছেন?
জবাবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শুরু থেকেই বলে আসছেন, ইরানে এ অভিযান মোট চার থেকে ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। এখনও এটাই তার (ট্রাম্প) অভিমত।”
ক্যারোলিন দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা অব্যাহত রয়েছে এবং ভালোভাবে এগুচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে স্থলসেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাকে বাতিল করেননি উল্লেখ করে ক্যারোলিন আরও বলেন, “কূটনীতি এখনও ট্রাম্পের প্রথম পছন্দ।”
ইরানের অবস্থান
ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে রেজা তুরস্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে বলেছেন, “তেহরান আগ্রাসনকারীদের শাস্তি দেয়া, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি রোধে কাজ চালিয়ে যাবে।”
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা এ তথ্য জানিয়ে বলেছে, তেহরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করা হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেয়ায় জ্বালানির বিশ্ববাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এ পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সোমবারও ইসরাইলকে লক্ষ্য করে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। পাশাপাশি লেবাননের রাজধানী বৈরুতে হিজবুল্লাহর ব্যবহৃত অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে তারা। তবে ইসরাইলও স্বস্তিতে নেই। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইসরাইলে রকেট হামলা বাড়িয়েছে।
একই সঙ্গে ইয়েমেন থেকে ইরান-সমর্থিত হুতিরা প্রথমবারের মতো ইসরাইলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এক মাস আগে যুদ্ধের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি ও সেনা অবস্থানকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করছিল ইরান। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানিক্ষেত্রের মতো বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। যুদ্ধের পরিসরও বেড়েছে। সেটি এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ছড়িয়েছে।