https://www.a1news24.com
২১শে জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১:০০

মানবতা ও আমাদের করণীয়

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক-পৃথিবীতে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব—মানবজাতীর এই মর্যাদা শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের জন্য নয়, বরং মানবতা, সহমর্মিতা ও নৈতিকতার জন্য বিদ্যমান। মানবতা এমন এক মহৎ গুণ, যা মানুষকে অন্যের দুঃখে কাঁদতে, বিপদে পাশে দাঁড়াতে এবং সমাজে শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ প্রদান করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক জীবনের ব্যস্ততায় মানবিক মূল্যবোধ যেন ক্রমেই বিলীন হয়ে পড়ছে। কোথাও যুদ্ধ, কোথাও ক্ষুধা, কোথাও বৈষম্য, কোথাও আবার নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অসংখ্য মানুষ। এমন বাস্তবতায় মানবতার চর্চা আর বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

মানবতা শুধু দান-খয়রাতে সীমাদ্ধ নয়। মানবতা হলো অন্যের অধিকারকে সম্মান করা, মানুষের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখা এবং জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষার বিভেদ ভুলে আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানুষ’কে মূল্যায়ন করা। একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাদ্য দেওয়া যেমন মানবতা, তেমনি একজন নির্যাতিত মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের দাবি তোলাও মানবতার অংশ। একজন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো যেমন মানবতা, তেমনি একজন শিক্ষাবঞ্চিত শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়াও মানবতার বহিঃ প্রকাশ।

বর্তমান সমাজে মানবিক অবক্ষয়ের নানা চিত্র আমাদের উদ্বিগ্ন করে। পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ কমছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ও অপমানের সংস্কৃতি চোখে পড়ার মত। সড়ক দুর্ঘটনায় আহত মানুষকে হাসপাতালে নেওয়ার আগে ভিডিও ধারণের প্রবণতা কিংবা অসহায় মানুষের দুর্দশাকে বিনোদনের উপকরণে পরিণত করার মানসিকতা আমাদের মানবিক সংকটেরই প্রতিফলন। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, মানবিক শিক্ষা ছাড়া একটি সভ্য সমাজ গঠন অসম্ভব।

মানবতার প্রথম করণীয় পরিবার থেকেই নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার চর্চা শুরু করতে হবে। শিশুরা পরিবার থেকেই ভালোবাসা, সহানুভূতি, সততা ও দায়িত্ববোধ শেখে। বাবা-মা যদি সন্তানকে শুধু ভালো ফলাফল বা অর্থ উপার্জনের শিক্ষা দেন, কিন্তু মানুষ হওয়ার শিক্ষা না দেন, তাহলে সমাজে দক্ষ মানুষ তৈরি হবে, কিন্তু মানবিক মানুষ তৈরি হবে না। তাই পরিবারকে মানবিকতার প্রথম বিদ্যালয়ে পরিণত করতে হবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার মাধ্যম নয়; এটি একজন মানুষকে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। পাঠ্যক্রমে নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক দায়িত্ববোধ, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শুধু প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতার মনোভাব শেখাতে হবে।

ধর্মীয় শিক্ষা মানবতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। পৃথিবীর সব ধর্মই মানুষকে ভালোবাসা, দয়া, ক্ষমাশীলতা এবং ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। ইসলামে বলা হয়েছে, “মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে মানুষের উপকার করে।” একইভাবে অন্যান্য ধর্মও মানবসেবাকে ঈশ্বরের সেবার সমতুল্য বলে বিবেচনা করে। তাই ধর্মকে বিভেদের হাতিয়ার না বানিয়ে মানবতার শক্তিতে পরিণত করা ঈমানি দায়িত্ব।

সমাজের বিত্তবান ও সক্ষম মানুষেরও বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে। সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধু দান নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করাও মানবতার অংশ। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কার্যক্রমের মাধ্যমে মানবকল্যাণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

তরুণরা মানবতার সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে। আজকের তরুণদের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, রক্তদান, দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং শিক্ষাসেবামূলক নানা উদ্যোগ ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা জাগায়। তরুণদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ ছড়ানোর পরিবর্তে সচেতনতা, সহমর্মিতা এবং ইতিবাচক বার্তা প্রচারে এগিয়ে আসতে হবে।

রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব কম নয়। একটি মানবিক রাষ্ট্র নিশ্চিত করে যে, প্রতিটি নাগরিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মৌলিক অধিকার পাবে। দুর্নীতি, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্বল ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং দুর্যোগকবলিত মানুষের দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্ব।

বিশ্ব আজ জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট এবং দারিদ্র্যের মতো বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এসব সংকট মোকাবিলায় শুধু একটি দেশ বা একটি জাতির উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, মানবিক সহায়তা এবং বৈশ্বিক সংহতি আরও জোরদার করতে হবে। মানবতা কোনো দেশের সীমান্তে আটকে থাকে না; এটি সমগ্র বিশ্বের মানুষের অভিন্ন পরিচয়।

ব্যক্তিগত জীবনেও আমরা সহজ কিছু কাজের মাধ্যমে মানবতার চর্চা করতে পারি। প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া, অসহায় মানুষকে সম্মান করা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের যত্ন নেওয়া, রক্তদান করা, বৃক্ষরোপণ করা, প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা কিংবা কারও প্রতি অকারণ কঠোর ভাষা ব্যবহার না করাও মানবতারই প্রকাশ। ছোট ছোট মানবিক কাজগুলোই সমাজে বড় পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তোলে।

মানবতা কখনো দুর্বলতার পরিচয় নয়; বরং এটি একজন মানুষের সর্বোচ্চ শক্তি। অর্থ, ক্ষমতা কিংবা প্রযুক্তি একটি সমাজকে উন্নত করতে পারে, কিন্তু মানবিকতা ছাড়া সেই উন্নয়ন টেকসই হয় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব সমাজে মানবিক মূল্যবোধ শক্তিশালী ছিল, সেসব সমাজই দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জন করেছে।

পরিশেষে বলা যায়, মানবতার জন্য আমাদের করণীয় কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনচর্চা। পরিবার, শিক্ষা, ধর্ম, রাষ্ট্র এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ—সবকিছুর সমন্বয়ে মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। আমরা যদি নিজের অবস্থান থেকে একজন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই এবং মানুষের মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিই, তবে একটি সহমর্মী, ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠন সম্ভব হবে। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার ধর্ম, জাতি বা সম্পদ নয়—তার সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন মানুষ। আর এই মানবিক পরিচয়ই হোক আমাদের আগামী দিনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও মুদ্রণ ব্যবস্থাপক

আরো..