নিজস্ব প্রতিবেদক:কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজুম ইউনিয়নের তাজিয়াকাটা ও ঘটিভাঙ্গা গ্রামের ছয়টি জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্র সিলগালা করে দেওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় জেলেরা। হঠাৎ করে ডিজেল-পেট্রোল বিক্রির কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না অর্ধশতাধিক মাছ ধরার ট্রলার। এতে শুধু জেলেরা নন, তাঁদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও পড়েছে জীবিকা সংকটে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সুনির্দিষ্টভাবে তেল পাচারের প্রমাণ প্রকাশ না করেই মিয়ানমারে জ্বালানি পাচারের ‘গুঞ্জনের’ ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে এসব বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে একদিকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়েছে, অন্যদিকে দুই গ্রামের শত শত জেলে কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
গত ১৯ আগস্ট দুপুরে মহেশখালী উপজেলা প্রশাসনের অভিযানে তাজিয়াকাটা ও ঘটিভাঙ্গা এলাকায় পাঁচটি ভাসমান তেল (ডিজেল) বিক্রয়কেন্দ্র ও একটি স্থায়ী দোকান সিলগালা করা হয়। অভিযানে দুটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৬০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ যেন লঘু পাপে গুরুদণ্ড!
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত আহমেদ এ অভিযান পরিচালনা করেন বলে সে সময় ইউএনও ইমরান-মাহমুদ-ডালিম ভিডিও বার্তায় জানান।
প্রশাসনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে মেসার্স ফরহান ট্রেডিং ও মেসার্স জয়নাল ট্রেডিংসহ পাঁচটি ভাসমান তেল বিক্রয়কেন্দ্র এবং একটি স্থায়ী দোকান সিলগালা করা হয়। অভিযানের সময় মেসার্স ওসাম ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালু রাখায় ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্য পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়।
এর মধ্যে রাসেল এন্ড কোম্পানির মালিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তাকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক বা কর্মচারী ঘটনাস্থলে না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
‘তেল নেই, সাগরেও যেতে পারছি না’
ঘটিভাঙ্গা ও তাজিয়াকাটা দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের প্রত্যন্ত এলাকা। স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাগরে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল। মাছ ধরার নৌকা বা ট্রলার চালানোর প্রধান জ্বালানি ডিজেল। ফলে স্থানীয় তেল বিক্রয়কেন্দ্রগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাছ ধরার ট্রলারগুলোও অনেকটা অচল হয়ে পড়েছে।
জেলেদের ভাষ্য, দূরের এলাকা থেকে তেল সংগ্রহ করতে গেলে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ, সময় ও ঝুঁকি—সবই বাড়বে। অনেক ট্রলার মালিকের পক্ষে সেই খরচ বহন করা সম্ভব নয়। ফলে তেলের অভাবে একের পর এক ট্রলার ঘাটে পড়ে থাকলে জেলে, মাঝি, শ্রমিক, বরফ ব্যবসায়ী, মাছ ব্যবসায়ীসহ পুরো স্থানীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়বে।
তাজিয়াকাটার আব্দুর রহিম ও ঘটিভাঙ্গার শাহীন খান বলেন, স্থানীয় এসব ভাসমান তেল বিক্রয়কেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মাছ ধরার ট্রলারগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ করে আসছে। তাঁদের দাবি, তেলগুলো চোরাই নয়; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বৈধ লাইসেন্স ও চালানের মাধ্যমে ডিজেল-পেট্রোল সংগ্রহ করা হয়। তাঁরা আরো জানান, অধিকাংশ তেল চট্টগ্রাম থেকে ট্রাকে করে আনা হয়। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলসহ সংশ্লিষ্ট তেল বিপণন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনা।
তবে একই সঙ্গে স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে, এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকেরই জ্বালানি তেল মজুদ ও বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুমোদন নেই। কারও একটি অনুমোদন থাকলেও অন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেই। অর্থাৎ তেলের উৎস বৈধ হওয়ার দাবি থাকলেও ভাসমান স্থাপনা হিসেবে ব্যবসা পরিচালনার সব ধরনের আইনগত অনুমোদন সম্পূর্ণ আছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
অবৈধতা থাকলে বৈধ হওয়ার সুযোগ কোথায়?
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনার বিষয় হলো—কোনো প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বা অনুমোদনে ঘাটতি থাকলে সেটি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। কিন্তু একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন উঠছে, এসব ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে চলে আসার পর হঠাৎ একযোগে বন্ধ করে দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পূর্ণ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না। সরকারের রাজস্ব আদায়ের স্বার্থে সে বিষয়ও বিবেচনা করে দেখা উচিত।
প্রশাসনের অভিযান অবশ্যই আইনভঙ্গের বিরুদ্ধে হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল পাচার, অগ্নিনিরাপত্তা ঝুঁকি কিংবা নদীপথে অবৈধ স্থাপনা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কিন্তু অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রকৃত অপরাধ নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের ঘাটতি পূরণের সুযোগ—এই তিনটি বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ একটি প্রত্যন্ত উপকূলীয় এলাকার জ্বালানি সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে মাছ ধরার ওপর। আর মাছ ধরতে না পারলে জেলেদের আয় বন্ধ হয়, বন্ধ হয় বরফকল, মাছ পরিবহন, আড়ত ও সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবীদের কাজও।
তাই “নোটিশ না দিলেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান অবৈধ”—এমন সরল সিদ্ধান্তে না গিয়ে প্রশ্ন হওয়া উচিত, অভিযানে কোন আইনের কোন ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে, কোন অপরাধ ঘটনাস্থলে প্রতীয়মান হয়েছে, অভিযুক্তের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না এবং সিলগালা করার আইনগত ভিত্তি কী ছিল।
এ ক্ষেত্রেও প্রশাসনের কাছে স্বচ্ছভাবে জানানো প্রয়োজন—সিলগালার আদেশটি ভ্রাম্যমাণ আদালতের দণ্ডাদেশের অংশ, নাকি লাইসেন্স/অনুমোদন না থাকার কারণে প্রশাসনিক ব্যবস্থা; এবং কোন আইনি ক্ষমতাবলে স্থাপনাগুলো বন্ধ করা হয়েছে।
‘পাচারের প্রমাণ থাকলে ব্যবস্থা হোক, কিন্তু জেলেদের পথ বন্ধ নয়’
দুই গ্রামের স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, মিয়ানমারে তেল পাচারের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু পাচারের অভিযোগের সঙ্গে স্থানীয় জেলেদের জীবন-জীবিকাকে এক করে দেখা হলে তার খেসারত দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।
তাঁদের প্রশ্ন—কোনো একটি বা একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু একই এলাকার সব তেল বিক্রয়কেন্দ্র একসঙ্গে বন্ধ করে দেওয়ায় জেলেদের সাগরে যাওয়ার পথই বন্ধ হয়ে গেছে কেন?
তেল ছাড়া ট্রলার চলে না। আর ট্রলার না চললে জেলে সাগরে যেতে পারেন না। সাগরে যেতে না পারলে মাছ নেই, আয় নেই। আয় না থাকলে জেলেদের ঘরে খাবার, সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের চিকিৎসা—সবকিছুই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
দুই গ্রামে বাড়ছে উদ্বেগ
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন তেল বিক্রয়কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকলে শতাধিক মাছ ধরার ট্রলার অলস পড়ে থাকবে। এতে কয়েক শ জেলে সরাসরি কর্মহীন হওয়ার পাশাপাশি তাঁদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোও আর্থিক সংকটে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, বিষয়টি শুধু কয়েকটি তেল বিক্রয়কেন্দ্রের ব্যবসা নয়; এর সঙ্গে পুরো দুই গ্রামের অর্থনীতি ও জীবিকা জড়িত। দীর্ঘদিন কর্মহীনতা তৈরি হলে এলাকায় খাদ্যসংকট ও ঋণের চাপ বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় তাঁরা প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঘাটতি রয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে সব অনুমোদন গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হোক। একই সঙ্গে প্রতিটি ভাসমান ট্যাঙ্ক বা তেল বিক্রয়কেন্দ্রের নিরাপত্তা, ধারণক্ষমতা, তেলের উৎস ও লাইসেন্স যাচাই করে বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় চালুর সুযোগ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, অবৈধ তেল পাচার বন্ধ হোক—এটি তাঁরাও চান। কিন্তু এর দায় যেন মাছ ধরতে যাওয়া সাধারণ জেলেদের ঘাড়ে না পড়ে।
প্রশাসনের প্রতি স্থানীয়দের আকুতি
স্থানীয়দের মতে, প্রশাসন চাইলে একটি সমন্বিত যাচাই কমিটি করে প্রতিটি তেল বিক্রয়কেন্দ্রের কাগজপত্র পরীক্ষা করতে পারে। যেসব কাগজ নেই, সেগুলো সংগ্রহের জন্য নির্দিষ্ট সময় দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি তেল মজুদের পরিমাণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, তেলের উৎস ও বিক্রির হিসাব নিয়মিত নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব।
এতে একদিকে অবৈধ তেল পাচার বন্ধ হবে, অন্যদিকে বৈধভাবে ব্যবসা করতে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের সুযোগ তৈরি হবে এবং জেলেদের জীবন-জীবিকাও সচল থাকবে।
তাজিয়াকাটা ও ঘটিভাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারা এ বিষয়ে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মোহাম্মদ মাহাফুজ উল্লাহ ফরিদের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে একটি নির্দিষ্ট সময় দিয়ে সব ভাসমান তেল বিক্রয়কেন্দ্রকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হোক।
তাঁদের ভাষায়, “অবৈধ কিছু থাকলে বন্ধ করুন, কিন্তু বৈধ হওয়ার সুযোগটুকু দিন। তেল ছাড়া আমাদের ট্রলার চলে না, আর ট্রলার না চললে আমাদের সংসারও চলে না।”
এ বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট রুবায়েত আহমেদ বলেন, ‘অভিযান পরিচালনা করে আমি তেল বিক্রয় কেন্দ্রগুলো সিলগালা করে এসেছিলাম। এরপর এ বিষয়ে ইউএনও স্যার আমাকে কোনো নির্দেশনা দেননি। পরবর্তী নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান-মাহমুদ-ডালিম বলেন, ‘সিলগালা করা অস্থায়ী তেল বিক্রয় কেন্দ্রগুলোর মালিকেরা পুনর্বিবেচনার আবেদন করেছেন কি না, তা আমার জানা নেই। তবে এ বিষয়ে কোনো আবেদনের কপি আমি পাইনি। আবেদন পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমানে কেন্দ্রগুলো সিলগালা অবস্থায় রয়েছে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আ. মন্নান বলেন, ‘তেলের ব্যবসা পরিচালনা লাইসেন্সের বিষয়। হয়তো স্থানীয় প্রশাসন অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করেছে। ভুক্তভোগীরা আবেদন করলে জনস্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করে পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।’
এ বিষয়ে কক্সবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব আলমগীর মোহাম্মদ মাহাফুজ উল্লাহ ফরিদের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।