সরবরাহ সংকটে বাজারে সবজির দাম আকাশছোঁয়া, চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির :বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের ৯ উপজেলায় টানা অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ঘেরপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকার সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ঝড়ো হাওয়া ও ভারী বর্ষণে সবজির মাচা ভেঙে পড়েছে, অনেক স্থানে ক্ষেত তলিয়ে গিয়ে উচ্ছে, করলা, মরিচসহ বিভিন্ন সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবজির দাম বেড়ে আকাশছোঁয়া হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ভোক্তারা।
এতে আমন ধানের বীজতলা, পেঁপে, পান, বেগুন, কলা, আখসহ নানা প্রজাতির সবজির ক্ষেতের ক্ষতি হয়েছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। তারা বলছেন, টানা বৃষ্টিতে পানি জমে থাকায় গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে। বেশিরভাগ ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক কয়েক দফা ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় বাগেরহাটের ৯ উপজেলায় বিভিন্ন ইউনিয়নের সবজি চাষিরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। বিশেষ করে ঘেরপাড় এলাকায় চাষ করা মাচাভিত্তিক সবজির ক্ষয়ক্ষতি বেশি হয়েছে। ঝড়ো বাতাসে মাচা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি গাছের গোড়ায় দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অনেক ক্ষেতের গাছ পচে গেছে এবং ফলন নষ্ট হয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, উৎপাদন কমে যাওয়ায় স্থানীয় পাইকারি মোকাম ও খুচরা বাজারে সবজির সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রভাবে গত কয়েকদিনের ব্যবধানে বিভিন্ন সবজির দাম কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বৃহস্পতিবার উপজেলার শেরে বাংলা ডিগ্রি কলেজ সংলগ্ন পাইকারি সবজি বাজার ঘুরে দেখা যায়, বাজারে সবজির সরবরাহ তুলনামূলক কম। ব্যবসায়ীরা জানান, কৃষকদের ক্ষেত নষ্ট হওয়ায় আগের মতো সবজি বাজারে আসছে না। ফলে পাইকারি পর্যায়েই দাম বেড়ে গেছে।
পাইকারি বাজারের ব্যবসায়ী প্রীতম কুমার মহন্ত বলেন, “টানা বৃষ্টিতে অনেক কৃষকের ক্ষেতের সবজি নষ্ট হয়ে গেছে। বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় আমাদেরও বেশি দামে সবজি কিনতে হচ্ছে। এর প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়েছে।”
বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি মণ (৪০ কেজি) করলা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ১০০ টাকায়, যা কেজিপ্রতি ৭৭ টাকা ৫০ পয়সা। উচ্ছে বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৩ হাজার টাকায় (কেজিপ্রতি ৭৫ টাকা), ভেন্ডি ২ হাজার ৪০০ টাকায় (কেজিপ্রতি ৬০ টাকা) এবং শসা ১ হাজার ৭৮০ টাকায় (কেজিপ্রতি প্রায় ৪৪ টাকা ৫০ পয়সা)।
খুচরা বাজারে এসব সবজির দাম আরও বেশি হওয়ায় ক্রেতাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেক ক্রেতা অভিযোগ করেন, কয়েকদিনের ব্যবধানে বাজারে সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এতে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় এক ক্রেতা বলেন, “আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে কয়েক ধরনের সবজি কেনা যেত, এখন সেই টাকায় অর্ধেকও পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন বাজার করতে এসে নতুন করে চিন্তায় পড়তে হচ্ছে।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে গেলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে এলে কৃষকরা পুনরায় চাষাবাদ শুরু করতে পারবেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেতগুলো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হতে কিছুটা সময় লাগবে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বাজারে সবজির সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের জন্য সরকারি সহায়তা এবং কৃষি পুনর্বাসন কর্মসূচি গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, কৃষকদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হলে দ্রুত উৎপাদন স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে।বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেরিতে রোপণ করা যায় এমন ধান ও সবজির বীজে প্রণোদনা দিতে আঞ্চলিক অতিরিক্ত পরিচালকের সঙ্গে এরই মধ্যে আলোচনা হয়েছে। যাতে কৃষকরা ক্ষতিটা পুষিয়ে নিতে পারে।
উল্লেখ্য, জেলায় দুই সপ্তাহব্যাপী টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে ১ হাজার ৫৭৬ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আগামী দিনগুলোতে বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে এবং বাজারে সবজির দাম নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।