https://www.a1news24.com
১১ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:২০

জ্বালানি সংকটে বিশ্ব বিমান খাত, বিকল্প হিসেবে সামনে এসএএফ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে উড়োজাহাজ চলাচলের জ্বালানি বা ‘জেট ফুয়েল’-এর দাম কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে পৌঁছেছে। বাতিল হয়েছে হাজার হাজার ফ্লাইট। ইউরোপে উড়োজাহাজের জ্বালানির মজুত ৫০ শতাংশ কমে গেছে।

গোল্ডম্যান স্যাকস সতর্ক করেছে, জুনের মধ্যে জ্বালানির মজুত আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) নির্ধারিত ২৩ দিনের সংকটকালীন সীমার নিচে নেমে যেতে পারে। যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

ইরান যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় জেট ফুয়েলের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১৮১ ডলারে পৌঁছেছে। জ্বালানির এই উচ্চমূল্য ও চরম সংকটের কারণে বিমান সংস্থাগুলো বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

আগামী অক্টোবর পর্যন্ত ২০ হাজার ফ্লাইট বাতিল করেছে জার্মান পতাকাবাহী এয়ারলাইনস লুফথানসা। সরকারি সহায়তা না পাওয়ায় স্পিরিট এয়ারলাইন্স ধসে পড়েছে। আমেরিকান এয়ারলাইনস এবং ডেলটার মতো বিমান সংস্থাগুলো ২০০ থেকে ৪০০ কোটি ডলারের অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের মুখে পড়েছে।

এই সংকট কাটাতে বিকল্প জ্বালানির উৎস খোঁজার দিকেই বারবার মনোনিবেশ করতে হচ্ছে। আর সেখানেই নজর যাচ্ছে ‘সাসটেইনেবল অ্যাভিয়েশন ফুয়েল’ (এসএএফ) এর দিকে; যা নিয়ে বছরের পর বছর ধরে আলোচনা চলে আসছে, তবে এখনও তা সেভাবে কাজে লাগানো হয়নি।

এসএএফ মূলত ব্যবহৃত রান্নার তেল, কৃষি বর্জ্য এবং সঞ্চিত কার্বন থেকে তৈরি হয়। তবে এই জ্বালনি দিয়ে উড়োজাহাজ চালানোর কতটা কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে- প্রশ্ন সেটি। বর্তমানে ব্যবহার হওয়া এসএএফ-এর বেশিরভাগই আসে রান্নার তেল থেকে।

তবে এর বড় সীমাবদ্ধতা হল সীমিত সরবরাহ। আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ পরিবহন অ্যাসোসিয়েশন বলছে, কার্বন নির্গমন শুন্যের কোঠায় নামানোর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে প্রতিবছর অন্তত ২৫ কোটি টন ‘সাসটেইনেবল অ্যাভিয়েশন ফুয়েল’ (এসএএফ)- দরকার।

কিন্তু কয়েকটি গবেষণা ও পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান বলছে, ওই সময়ের মধ্যে বড়জোর ৪৯ কোটি টন এসএএফ পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া যেতে পারে। বিশ্বে ব্যবহৃত রান্নার তেলের সরবরাহ সীমিত। এই তেল কতটুকু পাওয়া যাবে সেটি মূল্যায়ন করাও কঠিন।

অন্যদিকে, এসএএফ এর আরেকটি উন্নত সংস্করণ যা কাঠের বর্জ্য, কৃষি বর্জ্য ও গাঁজানো অ্যালকোহল থেকে তৈরি করা হয়- সেটির উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ানো সম্ভব। তবে এই এসএএফ এখনও বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপকহারে চালু হয়নি।

উড়োজাহাজের জন্য পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিয়ে গবেষণা করা গবেষক রিগালের মতে, এসএফ এর উৎপাদন কিভাবে দ্রুত বাড়ানো যাবে সেখানেও কিছু কঠিন সীমাবদ্ধতা আছে। কারণ, এটি উৎপাদন করতে বিপুল পরিমাণ জমি লাগে এবং যারা এটি উৎপাদন করে তারা মূলত গাড়ির জন্য জ্বালানি তৈরি করে, উড়োজাহাজের জন্য নয়।

তবে তিনি বলেন, সবার চেয়ে বড় সমস্যা হল এই যে, এয়ারলাইনসগুলো নিজেরাই এখনও এসএএফ কিনতে এগিয়ে আসছে না। নতুন বিকল্পের দিকে না তাকিয়ে বরং এয়ারলাইন্সগুলো স্বল্প-মেয়াদে জ্বালানির ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে প্রচলিত উৎসগুলো থেকেই।

যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগারগুলোতে উৎপাদন বেড়েছে। সমুদ্রপথে জাহাজ ট্র্যাকিং প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যানুযায়ী, ইউরোপে উড়োজাহাজের জ্বালানি রপ্তানি গত ফেব্রুয়ারির তুলনায় এপ্রিলে ৪০০ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে দিনে ৯৪ হাজার ব্যারেলে।

এভাবে এয়ারলাইন্সগুলো প্রচলিত তেল শোধনাগার বা আমদানির ওপরই নির্ভর করছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোতেও উড়োজাহাজের জ্বালানি বিতরণ নিশ্চিত করার জন্য ‘অ্যাকসেলারেট ইইউ’ কর্মসূচি চালু করেছে ইউরোপীয় কমিশন।

তবে তেল সরবরাহে বাধা এমনকি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তিচুক্তি হয়ে গেলে পরেও মাসের পর মাস ধরেই থেকে যাবে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা। এক্ষেত্রে আরও দুটি বিকল্প জ্বালানি হল ইলেক্ট্রা-এসএএফ বা ই-এসএএফ।

এটি তৈরি করতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ (যেমন- সৌর বা বায়ু), পানি এবং ক্যাপচার করা কার্বন ব্যবহার করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় গ্রিন হাইড্রোজেন তৈরি করে তা কার্বনডাই অক্সাইডের সঙ্গে মিশিয়ে সিন্থেটিক ফুয়েল তৈরি করা হয়। তবে এই প্রযুক্তি এখনও খুব বেশি পরিপক্কতা অর্জন করেনি, এটি তৈরি করা ব্যয়বহুল এবং বিনিয়োগও কম হওয়ার কারণে এ জ্বালানি উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা আছে।

ইইউ এবং যুক্তরাজ্য অবশ্য এয়ারলাইন্সগুলোকে তাদের জ্বালানিতে এসএএফ এর অনুপাত বাড়ানোর আদেশ দিয়েছে এবং তারপর ই-এসএএফ’ও কাজে লাগানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এয়ারলাইন্সগুলো এসব লক্ষ্য পূরণের ক্ষেত্রে এই জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি থাকার কথা উল্লেখ করেছে।

যদিও এই জ্বালানির উৎপাদকরা বলছে ভিন্ন কথা। ইউরোপীয় কমিশনকে দেওয়া এক সমন্বিত চিঠিতে ই-এসএএফ উৎপাদনকারীরা বলেছেন, তারা এয়ারলাইন্সগুলোর মুল্যায়নের ঘোর বিরোধী।

তারা বলছেন, ইউরোপজুড়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ই-এসএএফ প্রকল্প বর্তমানে উন্নয়নের আওতায় আছে। এই প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই এখন চূড়ান্ত বিনিয়োগের সিদ্ধান্তের পথে অগ্রসর হচ্ছে। প্রকল্পগুলোতে ‘রিফুয়েলইইউ’ সময়সীমার মধ্যেই বিপুল পরিমাণে জ্বালানি সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

সূত্র: দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট

আরো..