ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা থমকে যাওয়ায় নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে হামলা আরও জোরদার করার হুমকি দিয়েছে তেহরান। অন্যদিকে জুনে হওয়া অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে রাজি নয় বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রয়টার্সকে দেওয়া বক্তব্যে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তেহরান ‘পুরোপুরি আক্রমণাত্মক’ অবস্থানে চলে যাবে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আলোচনা এবং গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার উদ্যোগ—দুটিই বর্তমানে কার্যত স্থবির। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত আরও দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত জুনে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। এতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত চুক্তিতে পৌঁছাতে ৬০ দিনের সময় নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান তাৎক্ষণিক ও স্থায়ীভাবে বন্ধের কথা বলা হয়েছিল। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরে সমঝোতাটি দ্রুত ভেঙে পড়ে।
সোমবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, জুনের অস্থায়ী চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
আইআরজিসির সঙ্গে গোপন যোগাযোগ
তবে কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সঙ্গে গোপনে যোগাযোগ শুরু করেছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানায়, সাবেক মার্কিন জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ এক ইরাকি কুর্দি নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন। ওই ব্যক্তির মাধ্যমে আইআরজিসির কমান্ডার জেনারেল আহমাদ ভাহিদির কাছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বার্তা পৌঁছানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
পরে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পও ওই যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
ট্রাম্পের জামাতা ও বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার সোমবার ফক্স নিউজকে বলেন, ইরান সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সক্রিয়।
হরমুজ নিয়ে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বিরোধ
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে। ইরানের দাবি, জুনের সমঝোতা স্মারকের একটি ধারা অনুযায়ী প্রণালিটি পরিচালনার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে।
এরপর অনুমোদনহীন পথে হরমুজ দিয়ে চলাচলের চেষ্টা করছে—এমন অভিযোগে ইরান বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালায়। গত ৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ওই সমঝোতা ‘শেষ হয়ে গেছে’।
ইরানের ওই কর্মকর্তা জানান, পরবর্তী আলোচনায় বসার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের সব শর্ত পূরণ করতে হবে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি পরিচালনা নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে পৃথক একটি সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। তেহরানের দাবি, দুই দেশ চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। তবে এই আলোচনায় ওমান হস্তক্ষেপ করলে দেশটির বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প।
ফক্স নিউজকে ট্রাম্প বলেন, ওমান বাধা দিলে দেশটির ওপর ভয়াবহ হামলা চালানো হবে।
সংঘাতের প্রভাবে ইরান ও লেবাননে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটেছে। পাশাপাশি ইরান জর্ডান, ওমান, কুয়েত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামোতেও হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারে উঠেছিল, যা যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। সোমবার দাম আরও ২ ডলারের বেশি বেড়ে ৯০ দশমিক ৮৭ ডলারে স্থির হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের কংগ্রেশনাল নির্বাচনের আগে পেট্রলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটিতে পেট্রলের দাম ছিল ৩ ডলারের নিচে।