নিজস্ব প্রতিবেদক-চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর থানা কোতোয়ালিতে ধারাবাহিক অপরাধবিরোধী অভিযান, মাঠকেন্দ্রিক তৎপরতা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকার কারণে আলোচনায় রয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আফতাব উদ্দীন।
অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে একাধিকবার ‘শ্রেষ্ঠ ওসি’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া এ কর্মকর্তা মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার কারণে অনেকের কাছে ‘অ্যাকশন ওসি’ কিংবা ‘ভাইরাল ওসি’ হিসেবেও পরিচিত।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে, যখন পুলিশের মনোবল ও জনআস্থা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, তখন মাঠপর্যায়ে ধারাবাহিক অভিযান, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান তৎপরতার মাধ্যমে আলোচনায় আসেন ওসি আফতাব উদ্দীন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটময় সময়ে তার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানগুলো বাহিনীর সদস্যদের মনোবল পুনরুজ্জীবিত করতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।
সিএমপির বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ মূল্যায়নে মামলা নিষ্পত্তি, ওয়ারেন্ট তামিল, মাদকবিরোধী অভিযান, সন্ত্রাস দমন এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকার জন্য তিনি একাধিকবার ‘শ্রেষ্ঠ ওসি’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র।
পুলিশ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি, তথ্যভিত্তিক অভিযান, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেই বর্তমানে সিএমপির আলোচিত কর্মকর্তাদের একজন হয়ে উঠেছেন আফতাব উদ্দীন।
সহকর্মীদের কাছে তিনি ‘ফিল্ড-অরিয়েন্টেড অফিসার’ হিসেবেও পরিচিত। নিয়মিত টহল, রাতভর অভিযানে উপস্থিতি, আকস্মিক চেকপোস্ট পরিদর্শন এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার দ্রুত প্রতিক্রিয়া—এসব কারণেই তার কর্মকাণ্ড আলোচনায় এসেছে।
চট্টগ্রাম নগরের বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা—আদালতপাড়া, স্টেশন রোড, রিয়াজউদ্দিন বাজার, পাথরঘাটা, লালদীঘি ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক লেনদেন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগ ছিল।
পুলিশ সূত্রের দাবি, কোতোয়ালি থানায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অভিযান শুরু করেন ওসি আফতাব উদ্দীন। তাঁর নেতৃত্বে গত চার মাসে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছেন চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি এবং বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামি।
একই সময়ে উদ্ধার করা হয়েছে দেশি-বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি, দেশীয় অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। পুলিশের দাবি, এসব অভিযানের কারণে অপরাধচক্রের মধ্যে চাপ তৈরি হয়েছে এবং অনেক এলাকায় অপরাধ প্রবণতা কমতে শুরু করেছে।
গত ৫ জানুয়ারি টাইগারপাস এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে পাঁচটি অস্ত্র মামলার আসামি মনিরকে একটি এলজি ও কার্তুজসহ গ্রেপ্তার করে কোতোয়ালি থানা পুলিশ।
এছাড়া, এপ্রিল মাসে নগরজুড়ে আলোচিত হাতের কব্জি বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায় প্রধান আসামি হিসেবে পরিচিত সবুজকে গ্রেপ্তার করা হয়। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে রক্তমাখা ধারালো অস্ত্র উদ্ধারের কথাও জানায় পুলিশ।
মাদকবিরোধী অভিযানে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসে পাথরঘাটা এলাকায়। একটি অ্যাম্বুলেন্সে তল্লাশি চালিয়ে গ্যাস সিলিন্ডারের ভেতরে বিশেষ কৌশলে লুকিয়ে রাখা ১ লাখ ৫ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় চক্রের মূল হোতাসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে কোতোয়ালি থানার অন্যতম বড় মাদকবিরোধী অভিযান ছিল এটি।
এছাড়া লালদীঘিরপাড় এলাকায় ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ পাঁচ সদস্যের একটি দলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পৃথক অভিযানে চোরাই গাড়ি, মোবাইল ফোন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ছিনতাই হওয়া দুই লাখ টাকাও উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বাসিন্দাদের অনেকে মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাতের ছিনতাই ও চাঁদাবাজির ঘটনা আগের তুলনায় কমেছে। ব্যবসায়ী মহলের ভাষ্য, পুলিশের টহল বৃদ্ধি এবং তাৎক্ষণিক অভিযানের কারণে অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে।
অভিযান প্রসঙ্গে কোতোয়ালি থানার ওসি মোহাম্মদ আফতাব উদ্দীন বলেন, “মাননীয় সিএমপি কমিশনার মহোদয়ের নির্দেশনায় কোতোয়ালি থানাকে অপরাধমুক্ত করতে আমরা দিনরাত কাজ করছি। সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ কিংবা মাদক ব্যবসায়ীদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, তারা শুধুই অপরাধী।”
তিনি আরও বলেন, “মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও জুয়ার বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স নীতি অব্যাহত থাকবে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীতে কোতোয়ালির মতো স্পর্শকাতর থানায় দায়িত্ব পালন করে নেতৃত্বগুণ ও প্রশাসনিক সক্ষমতার পরিচয় দিচ্ছেন তিনি।
একইসঙ্গে স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে থানাকে জনবান্ধব রাখারও চেষ্টা করছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তবে বিশ্লেষকদের অভিমত, কোতোয়ালির মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক নানা চাপও সামাল দিতে হয়। ফলে এমন দায়িত্বশীল পদে থাকা কর্মকর্তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও তুলনামূলক বেশি।
মাঠকেন্দ্রিক তৎপরতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতেও সিএমপির কার্যকর কর্মকর্তাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করতে পারবেন ওসি আফতাব উদ্দিন।