https://www.a1news24.com
১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ৭:০৮

সুন্দরবনে মুক্তিযুদ্ধ: ধানসাগর খালের সংঘর্ষ ও নদীপথে বীরত্বগাঁথা

এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:সুন্দরবনের নদী-খাল, গহিন বন আর জোয়ারভাটা–এই প্রতিকূল পরিবেশকেই আশ্রয় করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ লড়াই চালিয়ে গেছেন বাংলার সাহসী যোদ্ধারা। এমনই একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকে, ধানসাগর খালে।
ধানসাগর খালের যুদ্ধ: রাতের সাহসী অভিযান

সেপ্টেম্বরের ২৪-২৫ তারিখের দিকে স.ম. কবীর আহমদ মধু ও আমজাদ আলী মল্লিকের নেতৃত্বে ১০-১২ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল সুন্দরবন থেকে নৌকায় রওনা দেন লোকালয়ের দিকে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করে তা ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনা।

রাত আনুমানিক ৩টার দিকে, যখন তারা ধানসাগর খালের ফরেস্ট অফিসের কাছাকাছি পৌঁছান, তখন হঠাৎ মুখোমুখি হন তিনটি নৌকায় অবস্থানরত রাজাকারদের সঙ্গে। রাজাকাররা প্রথমে গুলি চালায়, মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা জবাব দেন। এই সংঘর্ষে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি নৌকার মাঝি গুলিবিদ্ধ হন, তবে রাজাকারদের তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়, বাকিরা পালিয়ে যায়। ভোর হওয়ার আগেই তারা ক্যাম্পে ফিরে আসেন।
মাঝি আবুল হাশেম হাওলাদারের সাহসগাঁথা

২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠ পত্রিকায় প্রকাশিত এক স্মৃতিচারণে, পিরোজপুরের কাউখালীর জোলাগাতী গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম হাওলাদার বলেন:

“হাসনাবাদ থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও অস্ত্রের চালান নিয়ে এক রাতে রওনা দিই সুন্দরবনের দিকে। ঘন অন্ধকার, বৃষ্টি, আর নদীতে ঝড়ের মধ্যে হঠাৎ দেখতে পাই পাকিস্তানি সেনাদের গানবোট। গুলি শুরু হয় দুই দিক থেকে। একটি গুলি এসে আমার বাঁ হাতে লাগে—একটা আঙুল উড়ে যায়। আহত অবস্থাতেই আমি নৌকার হাল ধরে রাখি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে ক্যাম্পে ফিরিয়ে আনি।”

অপারেশন জ্যাকপট ও নৌ-কমান্ডোদের বীরত্ব

নৌ-সেনা লে. কমান্ডার (অব.) মো. জালাল উদ্দিন বীর-উত্তম তার বই ‘মুক্তিযুদ্ধে নৌ-সেনানী’-তে লিখেছেন:

১৯৭১ সালের ৭ আগস্ট, তিনি ১৪ জন নৌ-কমান্ডো নিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রসহ পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউদ্দিনের দিকনির্দেশনায় চব্বিশ পরগনার বিএসএফ ঘাঁটি থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর চালনা ও হিরণ পয়েন্টে অভিযানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। লক্ষ্য ছিল অপারেশন জ্যাকপট—লিম্পেট মাইন দিয়ে শত্রুবাহিনীর জাহাজ ধ্বংস করা।

১৪ আগস্ট মধ্যরাতে, কলকাতা বেতার থেকে সংকেত পাওয়ার পর হিরণ পয়েন্টে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কিন্তু সেদিন পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বন্দরের জাহাজগুলো ভেতরে সরিয়ে নেওয়ায় মূল লক্ষ্য পূরণ হয়নি। তবে বন বিভাগের একটি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয় এবং অভিযানে অংশগ্রহণকারী দল চালনা বন্দরের এক জাহাজ ‘লাইটিং থান্ডার’-এ সফলভাবে হামলা চালায়।
সুন্দরবনের প্রতিরোধ: নদীপথে জয়যাত্রা

সুন্দরবনের বলেশ্বর, পশুর, ভোলা, শিবসা, রায়মঙ্গল, শেলা, শিবশা, পাথুরিয়া, বাংরা, হরিণঘাটা, নীলকমলসহ অসংখ্য নদীতে ছোট-বড় বহু সংঘর্ষ ও অপারেশন সংঘটিত হয়েছিল। এই অঞ্চলের প্রতিকূল ভূপ্রকৃতি এবং জনসমর্থনের কারণে মুক্তিযোদ্ধারা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। নদীপথ হয়ে ধাপে ধাপে এগিয়েছে বাঙালির বিজয়ের রূপরেখা।

আরো..