https://www.a1news24.com
১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ৬:৫০

সুন্দরবনে পর্যটকদের ‘স্মৃতিচিহ্ন’ : প্লাস্টিক দূষণে হুমকির মুখে ম্যানগ্রোভ জীববৈচিত্র্য

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে: বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের অকৃত্রিম সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ভিড় করেন এর জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে—করমজল, কলাগাছিয়া, মান্দারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্ট ও দুবলার চরসহ নানা এলাকায়। তবে পর্যটনের এই উচ্ছলতার আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক নীরব হুমকি—প্লাস্টিক দূষণ। পর্যটকদের অসচেতনতা ও দায়িত্বহীন আচরণের কারণে সুন্দরবনের পরিবেশ এখন ক্রমেই বিষাক্ত হয়ে উঠছে।

নৈসর্গিক বনাঞ্চলে প্লাস্টিকের ছোবল

সরেজমিনে করমজল ও কলাগাছিয়া পর্যটন কেন্দ্রে ঘুরে দেখা গেছে, ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও পর্যটকরা হাঁটা পথ, নদীর পাড়, গাছপালা এমনকি কুমির ও কচ্ছপ প্রজনন কেন্দ্রের আশেপাশেও ফেলে যাচ্ছেন প্লাস্টিক বোতল, চিপসের প্যাকেট, খাবারের মোড়ক, পলিথিন ব্যাগসহ নানা অপচনশীল বর্জ্য। এই দৃশ্য শুধু সুন্দরবনের সৌন্দর্য নষ্ট করছে না, বরং ধ্বংস করছে এর প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

পর্যটকদের ফেলে যাওয়া এই বর্জ্য মাটির গুণাগুণ নষ্ট করছে, পানিপ্রবাহে বাধা দিচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই প্লাস্টিক মাইক্রোপ্লাস্টিকে রূপান্তরিত হয়ে জলজ প্রাণীর খাদ্য চক্রে প্রবেশ করছে, যা মাছ, কাঁকড়া, কচ্ছপসহ জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
বন্যপ্রাণীর জন্য নীরব ঘাতক

পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক খাবার ভেবে খেয়ে ফেলছে হরিণ, বানর, বুনো শূকরসহ নানা বন্যপ্রাণী। এতে তাদের হজমে সমস্যা হয়, খাদ্যনালী বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি শ্বাসরোধ হয়ে প্রাণহানিও ঘটছে। করমজলের গাইড রফিক সানা বলেন, “অনেকবার বানরকে প্লাস্টিক চিবোতে দেখি, তখন খুব খারাপ লাগে। আমরা পরিষ্কার করার চেষ্টা করি, কিন্তু সবসময় পারি না।”

সচেতনতার অভাবই মূল বাধা

শ্যামনগরের অভিজ্ঞ ট্যুর অপারেটর মাসুমবিল্লাহ বলেন, “জাহাজে ব্যাগ দিয়ে প্লাস্টিক জমা রাখার অনুরোধ জানানো হলেও অনেক পর্যটকই তা মানেন না। ফিরে আসার সময় দেখা যায় তারা যত্রতত্র আবর্জনা ফেলে রেখে গেছেন।”

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ পর্যটকের মধ্যেই সুন্দরবনের পরিবেশগত সংবেদনশীলতা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে, কেউ আবার অজান্তেই পরিবেশে ক্ষতিকর আচরণ করে থাকেন।
সমাধানে কী করা যেতে পারে?

বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় প্রশাসন মনে করেন, সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া সুন্দরবনকে প্লাস্টিক দূষণ থেকে রক্ষা করা যাবে না। এজন্য—

সুন্দরবনে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক নিষিদ্ধ করতে হবে

প্রতিটি পর্যটন এলাকায় তথ্য বোর্ড, লিফলেট, সচেতনতামূলক ভিডিও বার্তা চালু করতে হবে

জাহাজ ও বোটে আবর্জনা জমা রাখার ব্যবস্থা রাখতে হবে

ডাস্টবিন ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে

পর্যটকরা প্লাস্টিক বহন করলে জামানত ব্যবস্থা চালু করে তা ফেরত দেওয়ার সময় প্লাস্টিক জমা দিতে হবে

পরিবেশবান্ধব ট্যুর অপারেটরদের পুরস্কার ও স্বীকৃতি দিতে হবে

প্রশাসনের অবস্থান

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. রনী খাতুন বলেন, “আগামী পর্যটন মৌসুমে ট্যুর অপারেটর ও গাইডদের নিয়ে বসে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগের মাধ্যমেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও বলেন, “সুন্দরবন শুধু আমাদের নয়, পৃথিবীর জন্যই এক অনন্য ঐতিহ্য। এর সৌন্দর্য যেমন উপভোগের অধিকার আমাদের আছে, তেমনি এটিকে রক্ষা করার দায়ও আমাদের সবার।

আরো..