https://www.a1news24.com
১৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ৭:০১

সুন্দরবনের উপকূলের মোরেলগঞ্জের শরণখোলার মানুষ সিডর আঘাতের ১৮ বছর

ভেড়িবাঁধের অভাবে আজও দুর্ভোগে,১৮ কিলোমিটার রাস্তা ও বেড়িবাঁধের দাবি

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি:দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল মৎস্যভান্ডার নামে খ্যাতবিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলের মানুষের জীবনে এক বিভীষিকাময় রাত ১৮ বছর আগে আজকের এই দিনে—২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর— উপকূলে ভয়াল আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন সিডর। সেই দিনের প্রলংকারি সিডরে উপকূলীয় বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলায় ৬৯৫ জন মারা গেছেন এবং এখন পর্যন্ত ৭৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।মোরেলগঞ্জের ৯৩ জন মানুষের প্রাণহানী ঘটে এখন পর্যন্ত ৫৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন সরকারি হিসাবে সিডরে শুধুমাত্র । ক্ষত বিক্ষত করে এ যোগাযোগ ব্যবস্থা রাস্তাঘাট। স্বজন হারা পরিবারকে আজও কাঁদিয়ে বেড়ায় দু:সময়ের স্মৃতি। সিডরের ১৮ বছরেও হয়নি এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি কাঙ্খিত বেড়িবাঁধ। ধ্বংস হয় ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট ও যোগাযোগব্যবস্থা। স্বজনহারা পরিবারগুলোর বুকফাটা আর্তনাদ আজও দগদগে ক্ষতের মতো তাড়া করে ফেরে।বারইখালী–ফেরীঘাট–বহরবুনিয়া হয়ে ঘষিয়াখালী পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার রাস্তা ও বেড়িবাঁধ দ্রুত নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ফেরীঘাট এলাকায় কিছু ডাম্পিং করা হলেও পরে কাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ।

দীর্ঘ ১৮ বছর পরও সিডরপীড়িত এলাকার মানুষের বহু প্রতীক্ষিত বেড়িবাঁধ নির্মাণের কাজ সম্পূর্ণ হয়নি—যা স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য এখনো সবচেয়ে বড় হতাশার জায়গা।

সরেজমিনে জানাগেছে, নদীর তীরবর্তী একদিকে বঙ্গোপসাগর অন্যদিকে সুন্দরবন ঘেষা উপকূলীয় মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা প্রায় ৪ লাখ মানুষের বসবাস। কৃষি নির্ভরশীল এ জনদের মানুষের প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে সংগ্রাম করে বেঁেত থাকতে হয়। প্রতি বছরই অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাস ও বণ্যায় নদী গর্ভে বিলীন হচ্ছে শত শত বিঘা ফসলি জমি।সেই রাতের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ শরণখোলা পরিণত হয়েছিল মৃত্যুপুরীতে। প্রাণ হারিয়েছিল সহস্রাধিক মানুষ।

সেদিন রাতের সেই বিভীষিকা আজও ভুলতে পারেনি শরণখোলার মানুষ। প্রবল জলোচ্ছ্বাসে মূহুর্তেই ভেসে গিয়েছিল মানুষের বসতঘর, গবাদিপশু, গাছপালা ও ক্ষেতের ফসল। চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। সবখানেই শোনা যাচ্ছিল স্বজনহারা মানুষের বিলাপ। টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় সিডরের আঘাতে নাজুক বাঁধ ভেঙে বলেশ্বর নদের জলোচ্ছ্বাসে ধ্বংস্তুপে পরিণত হয় শরণখোলার সাইথখালীসহ এই জনপদ।

অপরদিকে লবণাক্ততার কারনে একাধিক ফসল উৎপাদনে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে কৃষক। ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর সুপার সাইক্লোন সিডরের আঘাতে লন্ড ভন্ড হয়ে যায় মানুষের জীবনযাত্রা। পানগুছি নদীর তীরবর্তী বহরবুনিয়া, বারইখালী, মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গাবতলা, শ্রেনীখালীসহ ২৫টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ প্রতি নিয়ত নদী ভাঙ্গনের কবলে। যে কারনে তাদের জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হচ্ছে।

সিডরে সন্তানহারা বলইবুনিয়া ইউনিয়নের দোনা গ্রামের মা ইউপি সদস্য রাজিয়া বেগমের ছেলে রিয়াজুল ইসলামের ছবি বুকে নিয়ে অঝরো কাদলেন। ১৫ নভেম্বর এ দিনটি এলেই ছেলের অসংখ্য স্মৃতি কাঁদিয়ে বেড়ায়। তিনি বলেন, একমাত্র ছেলে রিয়াজুল ইসলাম মোল্লা ১ মাস ২২ দিন শিশু পুত্রকে রেখে সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে সিডরে নিহত হন। তার সেই ছোট্ট ছেলে সিয়াম এখন এইচএসসি প্রথম বর্ষের ছাত্র। সিডরের ১৮ বছর হলেও নদীর তীরবর্তী এ গ্রামের বাসিন্দারা ভেড়িবাঁধ এখন পায়নি। কাজটি শুরু হলেও ধীরগতি, ভেড়িবাঁধের কাজটি গ্রুত সম্পন্ন করার জোর দাবি জানান সরকারের প্রতি।

সিডরে নিহত এ গ্রামের একই পরিবারের ৩ জন নিহত। তারা হলেন, বৃদ্ধ নূর মোহাম্মদ মোল্লা তার স্ত্রী জহুর বেগম, ছেলে সেলিম মোল্লা ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর রাতে ঝড়ে বাড়ি থেকে বের হয়নি। যখন পানির চাপ বেড়ে যায় বাড়ি থেকে সাইক্লোন শেল্টারে যাওয়ার পথিমধ্যে পানির স্রোতে পাসেই নদীতে ভাসিয়ে নিয়ে যায় বৃদ্ধ নূর মোহাম্মদ ও স্ত্রী জহুর বেগমকে। ঝড়ের ৩দিন পরে ধান ক্ষেত থেকে লাশ উদ্ধার করা হয়। ছেলে সেলিম মোল্লা সাগরে ছিলো মাছ ধরার কাজে। সেখানে তার মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। পরিবারের তাদের ছোট ছেলে আলিম মোল্লা পুলিশ সদস্য হিসেবে ঢাকায় কর্মরত, মেয়ে বিউটি আক্তার খুলনায় স্বামীর বাড়িতে রয়েছে বলে ফুফাতো ভাই আকবার মোল্লা ও শাহদাত মোল্লা জানান। এ রকম সেদিন কালিকাবাড়ি গ্রামের প্রতিবন্ধী শিপলু শেখ, সবুজ শেখসহ ৪ জন সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিহত হন, বারইখালী কাষ্মির এলাকার আব্দল মান্না শেখ সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিহত হয়েছেন।

এ রকম মোরেলগঞ্জ উপজেলায় ৯৩ জনের প্রাণহানি ঘটে। এদিকে বারইখালী, ফেরীঘাট হয়ে বহরবুনিয়া ঘষিয়াখালী অভিমুখী ১৮কিলোমিটার রাস্তা ও ভেড়িবাঁধের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় গ্রামবাসি। তারা বলেন, ফেরীঘাট থেকে কিছু স্থানে ডাম্পিং করা হলেও পরবর্তীতে কাজটি বন্ধ রয়েছে।

শরণখোলা উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন পঞ্চাতে বলেন, নদী শাসন ছাড়া টেকসই বাঁধ হওয়া সম্ভব নয়। তৎকালীন সরকার ও বিশ্বব্যাংক কর্তৃপক্ষ বাঁধ নির্মাণে নদী শাসনের ব্যাবস্থা না রেখে অদূরদর্শীতার পরিচয় দিয়েছে। ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে এখানে। মাটির বদলে নদীর বালু ব্যবহার করা হয়েছে। এতে শুধু বাঁধ উঁচুই হয়েছে, কিন্তু টেকসই হয়নি। দ্রুত নদী শাসন না করলে টই কোনোভাবে টিকবে না। বর্তমান সরকারের কাছে দুর্নীতি তদন্ত ও নদী শাসন করে বাঁধ রক্ষার দাবি জানান এই বিএনপি নেতা।

এ বিষয়ে বাগেরহাট পানি উন্ন য়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অধিক ঝূঁকিপূর্ণ প্রায় এক হাজার মিটার এলাকার ভাঙন রোধে প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে। এর মধ্যে শরণখোলার বগী এলাকার প্রায় ৭০০ মিটারে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ এবং সিসি ব্লক ও মোরেলগঞ্জ সীমানার ফাসিয়াতলা এলাকায় বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা হবে। এই কাজ শেষ হলেই জলোচ্ছ্বাসের হাত থেকে রক্ষা মিলবে শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জ উপজেলাবাসীর। মোরেলগঞ্জ উপজেলায় ইতোমধ্যে পানগুছি প্রকল্পের মাধ্যমে ৬শ’ ৫০ কোটি টাকার ভেড়িবাঁধের কাজ ২০২৩ সালে খাউলিয়া থেকে ফেরীঘাট পর্যন্ত সাড়ে ৪ কিলোমিটার এবং শ্রেনীখালী এলাকায় দেড় কিলোমিটার ভেরিবাঁধের কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি স্পটে জিও ব্যাগ ফেলে ডাম্পিং এর কাজ করা হয়েছে।

আরো..