কাঠ জব্দ না করে সাংবাদিক ‘ম্যানেজের’ চেষ্টা
টি.আই সানি, শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি: গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের যোগীরছিট মোড়ে (চেয়ারম্যানবাড়ি সংলগ্ন) সরকারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের গজারী গাছ কেটে অবৈধভাবে একটি করাতকল (স’মিল) চালুর অভিযোগ উঠেছে। মিলটি পরিচালনা করছেন কাওরাইদ ইউনিয়ন বিএনপির সদ্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক সামসুল হক মন্ডল ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মী রফিকুল ইসলাম রবি যৌথভাবে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) বিকেলে গিয়ে দেখা যায় ,স’মিলটি উদ্বোধনের পরপরই মিলের পাঠাতনে গজারী কাঠ ব্যবহার এবং মিলের পাশেই কাটাকাটা অবস্থায় সরকারি গজারী গাছের টুকরো পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সামসুল হক মন্ডলের ছোট ভাই কামরুল মন্ডল একজন আলোচিত হত্যা মামলার আসামি এবং রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ। ফলে উভয় পক্ষের ছত্রছায়ায় বনের গজারী গাছ নির্বিচারে কেটে স’মিল চালানোর অভিযোগ ঘনীভূত হচ্ছে।
অভিযোগ পেয়ে কাওরাইদ বিট কর্মকর্তা বনি শাহাদাত হোসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও জব্দ করা গাছ বা কাঠ আটক না করে উল্টো অভিযুক্তদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আচরণ করেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ করেছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে তিনি কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মৌখিকভাবে গাছ জব্দের কথা স্বীকার করলেও কোনো লিখিত বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকদের ‘ম্যানেজ’ করার চেষ্টাও করেন বলে একাধিক গণমাধ্যমকর্মী অভিযোগ করেছেন।এদিকে বিএনপি নেতা সামসুল হক মন্ডল দাবি করেন, “গজারী গাছগুলো তার বাবার পৈতৃক জমি থেকে কাটা হয়েছে।” বিপরীতে তার সহযোগী রবি বলেন, “গাজীপুরের অন্য স্থান থেকে কাঠ ক্রয় করা হয়েছে।” একাধিক বক্তব্যে সাংঘর্ষিক তথ্য উঠে এলে সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ঘটনার বিষয়ে শ্রীপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মোখলেছুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “বনের গাছ কেটে অবৈধ স’মিল চালনার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা তদন্ত করছি। যারা দায়ী, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো বিট কর্মকর্তা স্বজনপ্রীতি করলে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শ্রীপুর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুল মোতালেব সাংবাদিকদের বলেন:”যারা দলের নাম ব্যবহার করে অসামাজিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, তাদের কোনোভাবেই বিএনপির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে না। আমরা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের দলে কোনো জায়গা নেই।
বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক, সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক দল। কারো ব্যক্তিগত অপকর্মের দায় দল নেবে না। আমরা স্পষ্টভাবে বলতে চাই—দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়, তার বিরুদ্ধে দলীয়ভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়া হবে।
আমরা বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে আহ্বান জানাই, আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। দোষী যে-ই হোক, তার পরিচয় বড় নয়—অপরাধই মুখ্য।”
এই ঘটনায় বন বিভাগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি গজারী গাছ কেটে ব্যবসা পরিচালনা, মিল চালু করা এবং প্রশাসনের নীরবতা—সব মিলে বনের সম্পদ লুটপাটের স্পষ্ট প্রমাণ উঠে আসছে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের গাফিলতি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এই ধরনের দুর্বৃত্তচর্চাকে উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।