নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর মোহাম্মদপুরে মা ও মেয়েকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় গ্রেপ্তার গৃহকর্মী আয়েশার ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। একইসঙ্গে, তার স্বামী রাব্বির তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে।বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলমের আদালত শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
এদিন তাদের আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক মো. সহিদুল ওসমান মাসুম প্রত্যেকের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হারুন-অর-রশিদ রিমান্ডের পক্ষে শুনানি করেন। তবে, আসামিপক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। পরে আদালত আসামি আয়েশার ৬ দিন এবং তার স্বামী রাব্বি শিকদারের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এর আগে চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত লায়লা ফিরোজের স্বামী আ জ ম আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে গত ৮ ডিসেম্বর মোহাম্মদপুর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গত ৫ ডিসেম্বর আসামি আয়েশা বাদী আজিজুল ইসলামের বাসায় খণ্ডকালীন গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। গত ৮ ডিসেম্বর সকাল ৭টার সময় তিনি নিজের কর্মস্থল উত্তরায় চলে যান। কর্মস্থল থেকে তিনি স্ত্রীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে তিনি নিরুপায় হয়ে সকাল ১১টার সময় বাসায় ফেরত আসেন। এসে দেখেন, তার স্ত্রীর গলাসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় কাটা রক্তাক্ত জখম হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন এবং মেয়ের গলার ডান দিকে কাটা। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় মেইন গেটের দিকে পড়ে আছে তারা। তখন ওই অবস্থা দেখে মেয়েকে উদ্ধার করে পরিচ্ছন্নতাকর্মী মো. আশিকের মাধ্যমে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, বাসার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখতে পান— আসামি গৃহকর্মী আয়েশা সকাল ৭টা ৫১ মিনিটে কাজ করার জন্য বাসায় আসেন এবং সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটের সময় তার মেয়ের একটি মোবাইল, একটি ল্যাপটপ, স্বর্ণালংকার ও অর্থসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যান। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে বাদী নিশ্চিত হন যে, অজ্ঞাত কারণে সকাল ৭টা ৫১ থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যে যেকোনো সময় তার স্ত্রী ও মেয়েকে ছুরি অথবা অন্য কোনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে গুরুতর জখম করে হত্যা করা হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চাঞ্চল্যকর মা ও মেয়েকে খুনের ঘটনায় নতুন তথ্য দিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। চুরির উদ্দেশ্যেই মোহম্মদপুরের ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয় অভিযুক্ত আয়েশা। তার চুরি ধরে ফেলাই কাল হয়েছে মা-মেয়ের।
বৃহস্পতিবার (১১ ডিসেম্বর) সকালে রাজধানীর মিন্টো রোডে মিডিয়া সেন্টার সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম) এস এন মো. নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘আয়েশা চুরির উদ্দেশ্যেই মোহম্মদপুরের ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয়। চুরি ধরে ফেলায় প্রথমে মাকে হত্যা করে। পরে মেয়ে দেখে ফেলায় তাকেও হত্যা করে। হত্যার পর বাসায় চুরি করে স্কুল ড্রেস পরে পালিয়ে যান আয়েশা।’
গত ৮ ডিসেম্বর সকালে শাহজাহান রোডের ১৪ তলা একটি আবাসিক ভবনের সপ্তম তলার বাসায় লায়লা আফরোজ (৪৮) ও তার মেয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিয়াকে (১৫) ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। ঘটনার পর তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গৃহকর্মী বুধবার (১০ ডিসেম্বর) আয়েশাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি নলছিটি এলাকায় তার দাদা শ্বশুর বাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন।
আয়েশার বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, বাসার মালামাল চুরি করে নেওয়ার সময় লায়লা আফরোজের কাছে আয়েশা ধরা পড়ে। একপর্যায়ে লায়লা আফরোজ তাকে আটকে পুলিশে ফোন দিতে গেলে আয়েশা ধারালো ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে তাকে হত্যা করে।
মায়ের চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে মেয়ে নাফিজা বিনতে আজিজ দৌড়ে ড্রয়িংরুমে এসে মাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পায়। ওই সময় গৃহকর্মী তাকেও ধারালো ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করে, এরপর স্কুলড্রেস পরে পালিয়ে যায়।
আয়েশার স্বামী রাব্বির বরাতে পুলিশ আরও জানায়, মা-মেয়েকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না আয়েশার। স্বর্ণের গয়না ও কিছু মালামাল নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় আয়েশাকে পেছন থেকে ধরে ফেলেন লায়লা। ধরা পড়ার ভয়ে মা-মেয়েকে কুপিয়ে হত্যা করে আয়েশা।
সুরতহাল প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, লায়লা আফরোজের শরীরে প্রায় ৩০টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার মেয়ে নাফিসার শরীরে ছিল ৪টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন।