আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারত, চীন ও রাশিয়ার ত্রিপক্ষীয় জোট ‘আরআইসি’ আবারও সক্রিয় করার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে চীন। বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা শুধু দেশগুলোর পারস্পরিক স্বার্থেই নয়, বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার দিক থেকেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রুশ বার্তা সংস্থা ইজভেস্তিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, রাশিয়ার উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রেই রুদেনকো আশা প্রকাশ করেছেন, আরআইসি জোট পুনরায় চালু হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিষয়টি নিয়ে চীন ও ভারতের সঙ্গে আলোচনা করছি। এই জোটের পুনর্জাগরণ আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তিনটি কৌশলগত অংশীদার দেশের একটি ঐতিহাসিক কাঠামো—যারা ব্রিকসেরও প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।’
রুদেনকো আরও বলেন, ‘এই জোটের কার্যক্রম স্থগিত থাকা উচিত নয়। পরিস্থিতি অনুকূল হলে আবারও সক্রিয়ভাবে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
রুশ উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘চীন-রাশিয়া-ভারত সহযোগিতা শুধু নিজ নিজ দেশের জন্য নয়, এটি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি ও উন্নয়নের জন্যও সহায়ক। আমরা এই কাঠামোকে এগিয়ে নিতে ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতে প্রস্তুত।’
সাম্প্রতিক সময়ে তিন দেশের মধ্যে সম্পর্কোন্নয়নের নানা উদ্যোগ দেখা গেছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে যোগ দিতে চীন সফর করেন। সেখানে তিনি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন।
রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী লাভরভ আগেই জানিয়েছেন, আরআইসি জোটের কার্যক্রম মূলত কোভিড-১৯ মহামারির সময় থেমে যায়। এরপর ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে ভারত-চীন সীমান্ত সংঘর্ষের পর কার্যক্রম পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে। প্রায় চার বছর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক ‘জমে থাকা’ অবস্থায় ছিল। তবে ২০২৩ সালে ব্রিকস সম্মেলনে মোদি-চিনপিং বৈঠকের পর থেকে সম্পর্ক পুনঃস্বাভাবিককরণের চেষ্টা শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতায় জয়শঙ্করের সফরের আগে চীন সফর করেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং।
লাভরভ মে মাসে বলেন, ‘রাশিয়া আন্তরিকভাবে আরআইসি জোটকে পুনরায় সক্রিয় করতে চায়, কারণ ভারত ও চীন—এই দুই দেশের সঙ্গে আমাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, এই জোটের সূচনা হয়েছিল সাবেক রুশ প্রধানমন্ত্রী ইভজেনি প্রিমাকভের উদ্যোগে এবং এক সময় বিভিন্ন স্তরে প্রায় ২০টির মতো বৈঠকও হয়েছিল।
আরআইসি থেকেই পরবর্তীতে গড়ে ওঠে ব্রিকস এবং নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি)। এই মুহূর্তে ব্রিকস জোটে সদস্য সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০। তবে ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও পাকিস্তান ইস্যুতে বেইজিংয়ের অবস্থান—আরআইসির কার্যকারিতা সীমিত করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
বর্তমানে রাশিয়া ও চীনের পক্ষ থেকে আরআইসি জোটকে পুনরুজ্জীবিত করার আগ্রহ বেড়েছে। বিশেষ করে ভারতের কোয়াড সদস্যপদ নিয়ে বেইজিং উদ্বিগ্ন। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার এই জোটকে চীন মনে করে তার ভূরাজনৈতিক প্রভাব রোধের প্রয়াস হিসেবে। এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারতের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঘনিষ্ঠতা নিয়েও চিন্তিত মস্কো।
রাশিয়ার অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজের ইন্ডিয়ান স্টাডিজ সেন্টারের গবেষক লিডিয়া কুলিক বলেন, ‘ইউরেশিয়ায় শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার জন্য এই জোটের গুরুত্ব অপরিসীম। সংঘাতপীড়িত এই অঞ্চলে আরআইসি নতুন আশার সঞ্চার করতে পারে। চীন-ভারত সম্পর্কে জটিলতা থাকলেও রাশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা এই কাঠামোকে এগিয়ে নিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
সূত্র: পিটিআই রিপোর্ট