https://www.a1news24.com
১৩ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১১:২৭

বৈরী আবহাওয়ায় সুন্দরবনের উপকূলের মাছশিকার কার্যক্রমে স্থবিরতা, বিপাকে লক্ষাধিক জেলে

এস.এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:গভীর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের কারণে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলসহ কক্সবাজার উপকূলবর্তী এলাকাগুলোর লক্ষাধিক জেলে সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। নিষেধাজ্ঞা শেষে যখন জেলেরা গভীর সমুদ্রে ইলিশ শিকারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন একের পর এক সতর্ক সংকেতের কারণে মাছ ধরার ট্রলারগুলো ঘাটে নোঙর করে থাকতে বাধ্য হয়েছে।

মৎস্য আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, ট্রলারগুলোতে জাল, গেড়াফি, তেল, চাল, ডালসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ বোঝাই করা হলেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তারা সাগরে যেতে পারছে না। এতে উপকূলের কয়েক হাজার জেলে এখন বেকার, আর ট্রলার মালিক ও মাছ ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন চরম ক্ষতির মুখে।

এর আগে সরকার ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিনের মৎস্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর জেলেরা আশায় ছিলেন বড় ধরণের মাছ শিকারের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গত ২০ দিনে চার দফায় ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত জারি হওয়ায় কেউই গভীর সমুদ্রে নামতে পারছেন না। ফলে বাজারে দেখা দিয়েছে ইলিশসহ সামুদ্রিক মাছের সংকট।

কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীসহ উপকূলের বিভিন্ন ঘাটে প্রায় ছয় হাজারের বেশি ট্রলার নোঙর করা আছে। বেকার হয়ে পড়েছেন এক লাখেরও বেশি জেলে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকেই। ট্রলার মালিকদের ক্ষতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।

৬ নম্বর ঘাটে নোঙর করা এফবি নিশানের জেলে কুতুব উদ্দিন বলেন, “সাগর উত্তাল থাকায় ইলিশ ধরতে পারছি না। এখন সংসার কীভাবে চলবে, এই চিন্তায় দিন কাটছে।”
জেলে আরিফ বলেন, “১০ বছরের জেলে জীবনে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। কোনো আয়ে নেই, লোকসান গুনছি প্রতিনিয়ত।”

আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “বর্ষার মৌসুমে সাগর উত্তাল থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই জেলেদের সাগরে নামার আগে অবশ্যই আবহাওয়ার সতর্ক বার্তাগুলো মেনে চলা জরুরি।”

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্তায় বলা হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগরে দমকা ও ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। ফলে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

শরণখোলার জেলে সগির হোসেন, আব্দুস সোবহান ও আব্দুল মজিদ বলেন, “দুই মাস নিষেধাজ্ঞায় মাছ ধরতে পারিনি। এরপর শুরু হয়েছে নিম্নচাপ ও বৈরী আবহাওয়া। ধার-দেনা করে সংসার চলছে।” তাঁরা নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা কমিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

শরণখোলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন, “জেলেরা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকে পরিবার ফেলে অন্য জেলায় শ্রমিকের কাজ নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারের ভারতসংশ্লিষ্ট সমন্বিত নিষেধাজ্ঞা উদ্যোগের জন্য আমরা কৃতজ্ঞ, তবে আবহাওয়াজনিত দুর্যোগে সরকারি সহায়তা একান্ত প্রয়োজন।”

ট্রলার মালিক আবুল হোসেন ফরাজী বলেন, “গত এক মাসে ১৪ লাখ টাকার মালামাল নিয়ে ট্রলার পাঠিয়েছি, মাছ বিক্রি করেছি মাত্র ৪ লাখ টাকার। ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে পেশাই ছেড়ে দিতে হবে।”

বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, “সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মিলিয়ে উপকূলের জেলেরা মারাত্মক দুরবস্থায় পড়েছেন। মাছ কমে যাচ্ছে, লোকসান বাড়ছে। সরকারের উচিত জরুরি ভিত্তিতে প্রণোদনা ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা।”

আরো..