স্পোর্টস ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ নিয়ে এখন বিশ্ব জুড়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা, বিতর্ক ও সংশয়। একদিকে ফিফা যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল বাজারকে সম্প্রসারণের একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে সংস্থাটির এই আঞ্চলিক ঝোঁককে অনেকেই দেখছেন রাজনৈতিক ও করপোরেট স্বার্থে চালিত একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে। এর পেছনে অবশ্য কারণ রয়েছে। স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে এই টুর্নামেন্টের পেছনে চলছে এক অদৃশ্য খেলা। মাঠে যেন কোনো ফুটবল ম্যাচ নয় এ এক অপসাংস্কৃতিক নাটক, যার পরিচালক জিয়ান্নি ইনফান্তিনো আর মঞ্চসজ্জাকার ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর দর্শকরা? তারা কখনো মিডিয়ার প্রতিনিধি, কখনো সাধারণ ভক্ত, আবার কখনো চুপচাপ বসে থাকা নিষ্প্রাণ ভোগ্যপণ্য।
ক্লাব বিশ্বকাপের এই নতুন ‘সুপার ভার্শন’ যেটি অনেকটা স্টেরয়েডে আক্রান্ত ফিফার সংস্করণ প্রমাণ করে দিয়েছে, বিশ্বকাপ ২০২৬ কেবল ক্রীড়া আসর নয়, বরং এক রাজনৈতিক, করপোরেট, ও সাংস্কৃতিক ‘মেগা শো’ যার কেন্দ্রে খেলাটি নয়, বরং ক্ষমতা। ফিফা বর্তমানে শুধু বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা নয় বরং এক বিশ্বমঞ্চের করপোরেট কারিগর, যারা রাজনৈতিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র ও নেতাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফুটবলকে ব্যবহার করছে ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে। এবং যুক্তরাষ্ট্রে ফুটবলের এই নতুন রূপ উজ্জ্বল আলো, কারুকার্যযুক্ত ট্রফি, আর স্বল্পপরিচিত দলগুলোর মধ্যে বেমানান ধুমধাম কেবল একপেশে বিনোদন নয়; এটি এক দখলদারি সংস্কৃতি।
সাম্প্রতিক টুর্নামেন্টের মধ্যে ট্রাম্পের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রতীকী। তার ভাষণের মধ্যে ছিল নারী, ট্রান্স মানুষ ও অভিবাসীদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জুভেন্টাসের খেলোয়াড়রা যেন বাস্তব নয়, কোনো স্থিরচিত্রের অংশ। আর ইনফান্তিনো? তিনি কেবল মঞ্চে হাসছিলেন যেন এটিই তার কাঙ্ক্ষিত নাটক। এই অবস্থাকে অনেকেই আখ্যা দিচ্ছেন ‘ফুটবলের একনায়কতান্ত্রিক রূপ’ হিসেবে। মাঠে ফুটবল খেলা হয় ঠিকই, কিন্তু আসল খেলা চলছে ক্যামেরার বাইরে শক্তি, প্রভাব, আর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে।
ফিফা দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরপেক্ষ ও মানবাধিকার-সম্মত সংগঠন হিসেবে তুলে ধরলেও বাস্তব চিত্র বলছে উলটো কথা। বর্তমানে এটি এক ধরনের চলমান প্রচারণা মেশিনে পরিণত হয়েছে, যা রাজনীতিকদের স্বার্থরক্ষা করে, বিশেষত বিতর্কিত ও কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের। সেই ধারাবাহিকতায় এরই মধ্যে নিজস্ব ‘ফিফাহাব’ মিডিয়া প্ল্যাটফরম চালু করেছে, যা প্রথাগত সাংবাদিকতা এড়িয়ে এক ধরনের অনুগত ‘ইনফ্লুয়েন্সার সাংবাদিকতা’ তৈরি করছে। প্রশ্নহীন প্রচার, পূর্বনির্ধারিত প্রশ্ন, আর সেলিব্রিটিদের মঞ্চে এনে নির্মিত হচ্ছে একধরনের বিভ্রম, যেখানে সমালোচনা কেবল ‘নগণ্য হোয়াইট নয়েজ’ হিসেবে বিবেচিত।
অথচ ফুটবলকে জীবিত রেখেছে দক্ষিণ আমেরিকা ও ইউরোপ। দুই মহাদেশের ক্লাবগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবারের মালিকানায়, আমেরিকান হেজ ফান্ডের নিয়ন্ত্রণে। প্যাশনের জায়গায় এখন বিনিয়োগ বিশ্লেষণ, একাডেমির জায়গায় ট্রান্সফার মার্কেট। আর ফিফা? তারা যেন এখন এক বিশ্ব-মার্কেটিং এজেন্সি, যারা খেলা নয়, আয়োজন বিক্রি করে। তবে হঠাৎ সেখান থেকেই ক্যামন যেন মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। নতুন করে ঘাঁটি গাড়ছে মার্কিন মুল্লুকে। যেখানে ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর যুগলবন্দিতে ফুটবলকে হাইজ্যাক করে চকচকে এক ভবিষ্যৎ দেখানে। অনেকেই বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ক্লাব বিশ্বকাপ ও আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপকে বয়কট করলেই বার্তা দেওয়া যাবে।
কিন্তু সমস্যা হল-সেইগুলো নিয়ে এখন আর ফিফা ভাবে না। যা ইতিমধ্যে দেখা গেছে। চলমান ক্লাব বিশ্বকাপে ৭০ হাজার ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামে অধিকাংশ আসন খালি রেখেই পরিচালিত হচ্ছে ম্যাচ। উলসান হুন্দাই বনাম মামেলোডি সানডাউনসেরর ম্যাচে দর্শকসংখ্যা মাত্র ৩ হাজার ৪১২। অথচ টিকিটের দাম ছিল আকাশছোঁয়া। ফিফার টার্গেট এখন ‘ইনফ্লুয়েন্সার’, করপোরেট মিডিয়া। তাদের দিয়েই বাণিজ্য করতে মরিয়া ইনফান্তিনো। সেই লক্ষ্যই টুর্নামেন্টটি শুরুর আগে ফিফা প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন ‘ফুটবলের ভবিষ্যৎ এখানেই’।