চরাঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার চাকা ঘোরাচ্ছে ঘোড়া গাড়ি
সারওয়ার ভআলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ স্বাধীনতার ৫৩ বছরেও রংপুরের উন্নয়ন বঞ্চিত উপজেলা হিসেবে পরিচিত কাউনিয়া। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চল গুলোতে যোগাযোগের একমাত্র পরিবেশ বান্ধব বাহন ঘোড়া গাড়ি জীবন ও জীবিকার চাকা ঘোরাচ্ছে। চরাঞ্চলে ঘোড়া গাড়ির ব্যবহারের ফলে কর্র্র্ম সংস্থানের নব দিগন্তের সূচনা হয়েছে।
সরেজমিনে উপজেলা সদররের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তিস্তা নদী বেষ্টিত চর ঢুসমারা, প্রাননাথচর, চর নাজিরদহ, গোপিডাঙ্গা, চর গনাই, চর বিশ্বনাথ, হয়বতখাঁ চর, টাপুর চর, চর আজমখাঁসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল ঘুরে দেখাগেছে তিস্তার চরাঞ্চলে কৃষি পণ্য পরিবহনের একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। চরে রাস্তাঘাট না থাকায় অধিকাংশ ঘোড়ার গাড়িচালকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিভিন্ন চর থেকে কৃষি পণ্য আনা-নেওয়া করেন। বর্তমান আধুনিক যান্ত্রীক যুগে স্বাধীনতার ৫৩ বছরপরও চরাঞ্চলের মানুষ ঘোড়ার গাড়ির ওপর নির্ভরশীল। যোগাযোগ ব্যবস্থায় একমাত্র বাহন হিসেবে স্থান করে নিয়েছে পরিবেশ বান্ধব ঘোড়ার গাড়ি। বালু আর মরা তিস্তার শাখা নদীর রাস্তাসহ কাঁদা রাস্তায় যেখানে ভ্যান, রিক্সা, ট্রলী, ট্রাক যেতে পারে না সেই সকল রাস্তার জনপ্রিয় বাহন হিসেবে ঘোড়া গাড়ির কদর বেড়েছে। বিগত সময়ে কৃষকরা উত্তপ্ত বালুতে পায়ে হেঁটে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে নিজেদের উৎপাদিত পণ্য মাথায় বা ভারে করে নিয়ে আসতেন। ঘোড়ার গাড়ির উদ্ভাবনে চরাঞ্চলের মানুষের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। ঘোড়ার গাড়িতে করে কৃষকরা তাদের পণ্য পরিবহন, অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের কাজও সম্পন্ন করেন। কাউনিয়ায় বর্ষাকালে তিস্তা নদীসহ চরাঞ্চল তলিয়ে যাওয়ায় নৌকা একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। আর শুকনো মৌসুমে প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে থাকে ঘোড়ার গাড়ি। উপজেলার সিংহ ভাগ রবি শস্য, ধান, পাট, আলু, বাদাম, ভুট্টা, ডাল. পিয়াজ, মরিচ,বিভিন্ন ধরনের সবজি সহ অর্থকারী ফসল চরাঞ্চলেই বেশী উৎপাদন হয়। কৃষকের উৎপাদিত ফসল হাটে বাজারে নিয়ে যেতে না পারার কারনে কম দামে ফড়িয়া দালালদের কাছে বাধ্য হয়েই বিক্রয় করতে হতো। বর্তমানে ঘোড়ার গাড়ি চালু হওয়ায় কৃষক এখন তার উৎপাদিত ফসল হাটে নিয়ে গিয়ে ন্যায্য দামে বিক্রয় করতে পাচ্ছে। তিস্তা নদীর ১০ নাম্বার ঘাটের মালিক ছুলু বলেন, নদীতে পানি কমে চর ভেসে উঠেছে এবং এই চরের কৃষি পণ্য পরিবহনের একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ঘোড়ার গাড়ি। ঢুষমারা চরের ঘোড়াগাড়ি চালক আঃ করিম জানান, তিস্তার চরে সবসময় বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ হয়ে থাকে। ঘোড়ার গাড়ির মাধ্যমে প্রতিদিন ১৫-২০ মণ পণ্য পরিবহন করা হয় এবং প্রতি মণ ৬০ টাকা করে নেওয়া হয়। প্রতিদিন ঘোড়ার খাওয়ার জন্য ২৫০ টাকা খরচ হলেও, বাকি টাকা দিয়ে তার সংসার ভালোই চলে।
অপর চালক আউয়াল বলেন, শুকনা মৌসুমে ঘোড়া গাড়ী ও বর্ষা মৌসুমে নৌকা চালান তিনি। বর্তমানে ঘোড়া গাড়ী চালিয়ে প্রতিদিন ১০০০-১২০০ টাকা আয় করছেন। কৃষক ফরিদুল ও শাহিন জানান ঘোড়ার গাড়ী থাকায় তাদের উৎপাদিত পন্য হাটে নিয়ে ন্যায্য মূল্যে বিক্রয় করতে পাচ্ছে।চরাঞ্চলে এক সময়ে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো অনেক পরিবার, প্রায় ৫শতাধিক মানুষ ঘোড়া গাড়ি চালিয়ে পরিবার চাচ্ছেন।কাউনিয়ায় ঘোড়া গাড়ির চাকা প্রায় ৫শত পরিবারের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছে। বর্তমানে তারা পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে আছে। তিস্তার চরাঞ্চলে ঘোড়া গাড়ি কৃষকের দৈনন্দিন জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ঘোড়ার গাড়ি এখন শুধু পরিবহন নয়, জীবিকার মাধ্যম হিসেবেও স্থান করে নিয়েছে চরাঞ্চলের মানুষের মাঝে।
টেপামধুপুর ইউপি চেয়ারম্যান রাশেদুল ইসলাম জানান, ঘোড়া গাড়ি তার ইউনিয়নে ব্যাপক কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি করেছে। সরকারী ভাবে ঘোড়া গাড়ির চালকদের প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা সহ সহজ শতে ঋন প্রদানের দাবী জানান তিনি।